প্রেশার কুকার || Pressure Cooker

প্রেশার কুকার- নারীর জীবনের অন্য রকম এক ক্যানভাস

প্রেশার কুকার || Pressure Cooker (2026)
রায়হান রাফি || Raihan Rafi
Bangla
Bangladesh
172 Minutes
May 19, 2026
5.0 Author Ratingout of 10
এখানে পাখির চরিত্রের মাধ্যমে যে বিষয়গুলো পরিচালক দেখিয়েছেন তা হলো, নিম্নবিত্ত মেয়েগুলো নিজের পায়ে দাড়াতে – শুধু মাত্র একটু সম্মানের আশায় কত কষ্ট করে। পার্লারে কাজ করার টাকা পরিবার নিলেও সেই কাজের সম্মান করে না...

একটা প্রশ্নবিদ্ধ বিউটি পার্লার, কিছু মানুষ, তাদের জীবন। আর জীবনের চাপ। এই নিয়ে প্রেশার কুকার।

রায়হান রাফির সিনেমা প্রেশার কুকারকে বলা হচ্ছে রোজার ঈদের সারপ্রাইজ হিট। দলে দলে দর্শক দেখেছেন। প্রশংসায় মেতেছেন অভিনয় শিল্পীদের। তাণ্ডবের পর রায়হান রাফির সমালোচনায় মুখর থাকা মার্কেটপ্লেস হঠাৎ করেই প্রেশার কুকার দেখে একটু হলেও পজ দিয়েছেন।

দর্শক হিসেবে নিজের ভাবনাতেও দাড়ি কমা দিয়েছেন অনেকেই। বিশেষ করে প্রথম দৃশ্যে। বিশাল ফসলি ক্ষেতের মাঝে টুপি পরা এক নিঃসঙ্গ বালক। তার সামনে আভরণে আচ্ছাদিত একাধিক নারী অবয়ব। বালক বোছে না ঐ পোশাকের আড়ালে কে তার মা, কে তার অচেনা বা কে চেনা।

এই হলো গল্পের শুরু।

শুরুতেই একটা জনবহুল বাস। সেখানে এক মেয়ের তড়িঘড়ি করে কাজের জায়গায় যাবার আকুলতা। বাস নষ্ট। এক গাড়িতে লিফট নেওয়া। সেখান থেকে আরেক চরিত্রের সূচণা। বাসের ব্যাকুল মেয়েটি রেশমা, পরে যে পাখি হিসেবে পরিচিত হয় এই সিনেমাতেই। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি।

নাজিফা তুষিকে ঘিরেই সিনেমার গল্প এদিক সেদিক ডালা মেলেছে। মূলত এই সিনেমাটিতে নারী চরিত্রের সমাহার ঘটেছে। বিভিন্ন গল্পে সমাজের বিভিন্ন ধরণের নারীর জীবন ফুটে উঠেছে।

একদিকে দেখানো হয়েছে কিভাবে সামাজিক মাধ্যমকে পর্দা হিসেবে ব্যবহার করে কেউ কেউ পর্দার আড়ালে ভিন্ন মানুষ হয়েছে। কিভাবে সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাউকে জিম্মি করে ফেলা যায়। আবার কিভাবে ‘ক্রসফায়ার’কে পুঁজি করে কোনও অসৎ অফিসার ভয়ের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।

সিনেমার গল্প আগাতে থাকে রায়হান রাফির বিভিন্ন সিনেমার নামের সাথে ছন্দ মিলিয়ে। পরাণ নামটি স্ক্রিণে আসতেই দর্শক বুঝে নেয়, এবার প্রেমের গল্প আসবে। পরিবারের চাপানো সিদ্ধান্তকে পায়ে ঠেলে ভালোবাসা বেছে নেওয়া মেয়েটি কিভাবে হঠাৎ করেই বিপ্লবী হয়ে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যায়।সেটা দেখে দর্শক হাতে তালিও দিয়েছে।

আবার রেশমার পাখি হয়ে উঠাতে তারই সহকর্মীর সহযোগিতা আর আনন্দও দেখা যায়। পাখি মূলত ম্যাসাজ পার্লারে কাজ করে। সেখানে গোপন কক্ষে পুরুষের মন ও দেহ জুড়াতে আছে ভিন্ন সার্ভিস। যা ওখানে যারা কাজ করে জানে। কেউ করে । কেউ করে না। পাখি ছিল না করার দলে। কিন্তু একটা সময়ে টাকার চাপে নাজেহাল পাখি রাজি হয় বটে- কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠে না। ফলে তাকে গোপন কক্ষ থেকে কখনো তাড়িয়ে দেওয়া হয়, কখনো বারে তার উপর টাকা ছিটানো হয়।

পাখি ফিরে আসে মাথা নীচু করে। তার স্বামীকে খুঁজে বেড়ায়। যে হঠাৎ করে হাওয়া হয়ে গেছে। পাখি তার ছেলের জন্য হাহাকার করে, যে কিশোর ছেলে মায়ের থেকে শত মাইল দূরে কোনও এক মাদ্রাসাতে পরে। যেখানে বোরখা পরে পাখি ছেলের সাথে দেখা করতে আসে। পার্লারের বাইরেও সে বোরখাই পরে। আপন ভাই তার নাজুক অবস্থার হাল ব্যবহার করে প্রতারণা করে। তারও স্বামীও আসলে প্রতারণাই করেছে।

এই হলো পাখির জীবন প্রেশার কুকার সিনেমাতে। এখানে পাখির চরিত্রের মাধ্যমে যে বিষয়গুলো পরিচালক দেখিয়েছেন তা হলো, নিম্নবিত্ত মেয়েগুলো নিজের পায়ে দাড়াতে – শুধু মাত্র একটু সম্মানের আশায় কত কষ্ট করে। পার্লারে কাজ করার টাকা পরিবার নিলেও সেই কাজের সম্মান করে না।

অবশেষে পাখি এই সম্মান ছিনিয়ে নেয় নিজেকে পরিবর্তন করে। যে তার দিকে টাকা ছুড়ে মেরেছিল তার দিকে একইভাবে টাকা ছিটিয়ে দেয়। এই সিনেমার দুটো দৃশ্য – যা দেখে হলভর্তি দর্শক তালি দিয়েছে।

একটি হলো পাখির অপমানের শোধ নেওয়া। টাকা ছেটানোর বদলে টাকা ছেটানো।

আরেকটি দৃশ রোমহর্ষক- তা হলো, বিজয়ী পাখির ঠিক তাণ্ডবের শাকিব খানের মতন দুই হাত মেলে উপভোগ করার দৃশ্য। গুজবাম্প পুরো!

রায়হান রাফি তার সিনেমার লিগেসিকে যথার্থভাবে এই প্রেশার কুকারে ধারণ করিয়েছেন। আরও কিছু সংলাপ এনেছেন যা লোকমুখেই জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার পথে- ‘টাকা শশুর, টাকাই ভাসুর..’ এধরণের সংলাপগুলো।
সিনেমার বিভিন্ন ধাপে ‍সুরঙ্গ, তুফান, তাণ্ডব ও শেষে প্রেশার কুকার নাম অধ্যায় ভাগ করে সব সিনেমার থিমের সাথে মিলানো হয়েছে। বিশ্বজুড়ে পরিচিত ফরম্যাট হাইপারলিংক সিনেমা ফরম্যাটে নিজের সিনেমার টাইম ট্রাভেল পরিচালক বেশ ভালোভাবেই করিয়েছেন।

প্রেশার কুকারের কথা বললে নাজিফা তুষির নাম বারবার আসবেই। সিনেমার স্বার্থে গল্প না বললেও বাকীদের কথা না উল্লেখ করলে অন্যায় হবে বটেই। বিশেস করে শবনম বুবলির কথা। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, সকল কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে শবনম বুবলির মেধাটাকে ইন্ডাস্ট্রি ব্যবহার করতে এখনো পিছনে রয়ে গেছে। দেয়ালের দেশ বা প্রহেলিকাতে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন, প্রেশার কুকারে খুটি শক্ত করেছেন। স্নিগ্ধা চৌধুরী ও মারিয়া শান্ত নিজেদের মেলে ধরেছেন। পাখির বান্ধবীর চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীও দারুণ করেছেন।

সব মিলিয়ে প্রেশার কুকার ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’ নামে মুক্তি পেলেও মানাতো। কারণ, এই সিনেমার গল্পতে উচ্চভিলাষীতা, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, ক্ষমতাধর – সকল ধরনের নারীর কথা আছে মোটামুটি। স্লাইস অব লাইফ ধারায় কয়েকটা ধারা ছুটলেও সিনেমার স্বার্থে তা অন্য গল্পের জন্য রেখেই দেওয়া যায়।

এবার আসা যাক নির্মাণে। রায়হান রাফির সিনেমা দেখার স্রোতে অনেকটাই তাণ্ডবহীন মনে হলেও এর আর্ট ডিরেকশন ভালো হয়েছে। ম্যাসাজ পার্লারের লাইটিং, সজ্জা, অভিনয় সবই ঠিকঠাক। অপর দিকে তুষির নোয়াখালির উচ্চারণ দেখে হঠাৎ মনে হতেই পারে – তিনি হয়তো বাস্তবেও এভাবেই কথা বলেন। এখানেই শিল্পী সার্থক হয়েছেন।

তারেক মাসুদের ভক্ত যারা তারা সকলেই সিনেমার পোস্টার দেখে নড়েচড়ে বসেন। এযেন মাটির ময়নার ফিরে আসা। আসলেই তাই। প্রয়াত তারেক মাসুদকে উৎসর্গ করেই এই সিনেমার হৃদয়জয় করা সেই দৃশ্য, ফসলি ক্ষেতের কিশোর বালক, সামনে বোরখা পরা চেনা বা অচেনা রমনী। আর তার পোস্টার।

সিনেমার দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। আজকাল এতো বড় সিনেমার চর্চা নেই। ফলে মনে হতেই পারে- এটি হয়তো অন্য ফরম্যাটের জন্য চিন্তা করেই বানানো। কিন্তু শুধুমাত্র গল্পের আর অভিনয়ের জোরে সাড়ে তিনঘণ্টা দর্শক হলে সময় কাটিয়েছে। সিনেমার শেষে এসেও আছে অপর ঘটনার সাথে ক্রস কানেকশন। ঠিক যেভাবে গল্পটি শুরু – সেভাবেই।

 

এই সিনেমার চমকের পর চমক আজিজুল হাকিম, রিজভি রিজু, মিশা সওদাগর, চঞ্চল চৌধুরীসহ সকল শিল্পী। মন খুলে অভিনয় করেছেন। রায়হান রাফি তার উপর টানা সকল অভিযোগের উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন। নারীদের পরিণতি দেখালেও আগের সিনেমার মত নারী চরিত্রকে কেবল নেতিবাচকতার পর্দায় ঢাকেননি বা অপ্রয়োজনীয় চরিত্রেও রাখেননি।

সবকথার শেষ কথা- নাজিফা তুষি। ২০১৬ সালে আইসক্রিম সিনেমাটি করার পর এই দশ বছরে তুষি প্রমাণ করেছেন কি করে নিজেকে ধরে রাখা যায়। হাওয়া, রইদ বা প্রেশার কুকার- তুষি মানেই যেন এখন ভালো কিছু দেখার আশা। শিল্পীর জন্য এটা বড় পাওয়া।

রায়হান রাফির দ্বায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। নতুন গল্প বানানোর। সুন্দর ফ্রেম তৈরি করার। প্রেশার কুকারও সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। কিন্তু সেটা এতোটাই সামান্য যে ভালো চেষ্টা নিয়েই আলাপ করার তাগিদা মন থেকে আসে।
সিনেমাটি দেখে সকলে মন্তব্য করুক এই অনুরোধ রইল সকল দর্শকের প্রতি। হাজারো মানবিক গল্প মিলে একটা মন ছুঁয়ে দেওয়া বিশাল ক্যানভাস তৈরি করা যায়- প্রেশাস কুকার সিনেমাটি এর যথার্থ উদাহরণ।  


Final Verdict

২০১৬ সালে আইসক্রিম সিনেমাটি করার পর এই দশ বছরে তুষি প্রমাণ করেছেন কি করে নিজেকে ধরে রাখা যায়। হাওয়া, রইদ বা প্রেশার কুকার- তুষি মানেই যেন এখন ভালো কিছু দেখার আশা। শিল্পীর জন্য এটা বড় পাওয়া। রায়হান রাফির দ্বায়িত্ব আরও বেরে গেল। নতুন গল্প বানানোর।

23 views • 0 reviews
Rumpa
Rumpa Tiger
Film Critic
View all criticisms
Film Details
Film প্রেশার কুকার || Pressure Cooker
Director রায়হান রাফি || Raihan Rafi
Year 2026
Language Bangla
Country Bangladesh
Runtime 172 Minutes
Author Rating 5.0/10
Reader Rating 0/10 (0)

Reader Reviews

0 (0 reviews)

Rate & Review

5.0 /10

No reviews yet. Be the first to review!

Film Fiesta Newsletter

Stay in the Loop with Film Fiesta

Get the latest updates on screenings, festivals, critic reviews, and exclusive film events delivered straight to your inbox.

Join thousands of film lovers — no spam, unsubscribe anytime.