Rockstar (2026): রকস্টারের গল্প নাকি প্রেমিকের গল্প?
বাংলাদেশি মূলধারার চলচ্চিত্রে Rockstar নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা। বড় তারকা, বড় বাজেট, আন্তর্জাতিক লোকেশন, জমকালো ভিজুয়াল এবং সংগীত নির্ভর গল্প সব মিলিয়ে ছবিটি মুক্তির আগেই দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছিল। বিশেষ করে নাম যখন Rockstar, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল একজন সংগীতশিল্পীর উত্থান, শিল্পীসত্তার বিকাশ, খ্যাতির চাপ, সৃজনশীল সংকট এবং রক সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী উপস্থাপনা।
কিন্তু সিনেমা দেখার পর আমার মনে হয়েছে, Rockstar একজন রকস্টারের গল্পের চেয়ে একজন প্রেমিকের গল্প হিসেবেই বেশি কাজ করে।
রকস্টারের চেয়ে প্রেমিক বেশি
Stephen Herek পরিচালিত Rock Star (2001)-এর কথা যদি ধরা হয়, সেখানে সংগীত ছিল গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। একজন সাধারণ মানুষের রকস্টার হয়ে ওঠা, ব্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, খ্যাতির মূল্য, আত্মপরিচয়ের সংকট সবকিছুই সংগীতের জগতকে ঘিরে নির্মিত হয়েছিল। প্রেম ছিল, কিন্তু সেটি মূল গল্পের একটি অংশমাত্র।
অন্যদিকে Rockstar (2026)-এ সংগীতশিল্পীর জীবনকে ঘিরে গল্প শুরু হলেও খুব দ্রুত সেটি প্রেম, সম্পর্ক এবং আবেগগত দ্বন্দ্বের দিকে সরে যায়। ফলে একজন শিল্পীর সৃজনশীল যাত্রা, তার শিল্পী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া কিংবা সংগীতের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ককে যেভাবে অনুসন্ধান করা উচিত ছিল, তা খুব একটা দেখা যায় না।
অনেক সময় মনে হয়েছে, চরিত্রটি গান গায় বলেই সে রকস্টার; কিন্তু তার শিল্পীসত্তা কীভাবে গড়ে উঠল, কেন সে সংগীতকে বেছে নিল, সংগীত তার জীবনে কী অর্থ বহন করে এসব প্রশ্নের উত্তর ছবি খুব কমই দেয়।
দুর্বল গল্প, অসম্পূর্ণ আবেগ
ছবির সবচেয়ে বড় সমস্যা গল্পে।
গল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, কিন্তু সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আবেগগত ভিত্তি তৈরি করা হয় না। কিছু মোড় আসে হঠাৎ করে, কিছু সিদ্ধান্ত চরিত্রের স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ফলে গল্পের অনেক অংশই জোর করে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়।
একটি ভালো ড্রামা দর্শককে চরিত্রের অনুভূতির ভেতরে নিয়ে যায়। Rockstar অনেক সময় সেই অনুভূতি তৈরি না করে সরাসরি আবেগ দেখানোর চেষ্টা করে। ফলে কিছু দৃশ্য আবেগপ্রবণ হলেও আবেগময় হয়ে উঠতে পারে না।
চিত্রনাট্যের বড় সীমাবদ্ধতা
চিত্রনাট্যের মূল সমস্যা হলো এর অগ্রাধিকার নির্ধারণে।
ছবিটি আসলে কী হতে চায়—একজন শিল্পীর যাত্রা, একটি প্রেমের গল্প, নাকি খ্যাতির মূল্য নিয়ে একটি ড্রামা—এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না।
ফলে গল্প বারবার দিক পরিবর্তন করে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হলেও সেগুলোর পরিণতি যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। আবার কিছু বড় ঘটনা ঘটে গেলেও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গল্পে খুব বেশি অনুভূত হয় না।
চিত্রনাট্যের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো চরিত্রগুলোর ভেতরের পরিবর্তনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে না পারা।
ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের অভাব
একটি চলচ্চিত্রে চরিত্রের বিকাশ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, Rockstar ঠিক সেখানেই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে।
প্রধান চরিত্রের জীবন বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, সম্পর্ক বদলায়, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তার পরিবর্তনের ধাপগুলো স্পষ্টভাবে দেখানো হয় না। দর্শক জানে সে কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু সেই কষ্ট কীভাবে তাকে বদলে দিচ্ছে, সেটি পর্যাপ্তভাবে অনুভব করতে পারে না।
সহ-চরিত্রগুলোর অবস্থাও একই রকম। অনেক চরিত্র গল্পে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলেও তাদের ব্যক্তিত্ব, উদ্দেশ্য বা মানসিক জটিলতা খুব বেশি অনুসন্ধান করা হয়নি। ফলে তারা পূর্ণাঙ্গ মানুষ না হয়ে গল্পের প্রয়োজনীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে।
এ কারণেই সম্পর্কগুলোও অনেক ক্ষেত্রে গভীরতা হারিয়েছে।
অভিনয়: আন্তরিক কিন্তু সীমাবদ্ধ
শাকিব খান তার চরিত্রে আন্তরিক ছিলেন, এটি স্পষ্ট। তিনি চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করেছেন এবং কিছু দৃশ্যে সেই প্রচেষ্টা সফলও হয়েছে।
তবে অভিনয়ের সীমাবদ্ধতার চেয়ে বেশি চোখে পড়ে চরিত্রের সীমাবদ্ধতা। যখন চরিত্রই পর্যাপ্ত গভীরতা পায় না, তখন অভিনেতার পক্ষে সেই চরিত্রকে বহুমাত্রিক করে তোলা কঠিন হয়ে যায়।
সহ-অভিনেতারাও নিজেদের জায়গা থেকে ভালো করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু চিত্রনাট্য তাদের খুব বেশি সুযোগ দেয়নি।
সংগীত: ভালো, কিন্তু গল্পের চালিকাশক্তি নয়
ছবির নাম Rockstar হওয়ায় সংগীত নিয়ে প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি।
গানগুলো শ্রুতিমধুর এবং কিছু গান ছবির আবহ তৈরিতে সাহায্য করেছে। কিন্তু সংগীতকে গল্প বলার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি।
অনেক ক্লাসিক মিউজিক্যাল ড্রামায় গান চরিত্রের মানসিক অবস্থা, সংকট এবং পরিবর্তনকে প্রকাশ করে। এখানে গানগুলো অনেক সময় আলাদা ভালো লাগলেও গল্পের সঙ্গে গভীরভাবে একীভূত হতে পারেনি।
ফলে সংগীত ছবির একটি শক্তিশালী উপাদান হলেও গল্পের আত্মা হয়ে উঠতে পারেনি।
ভিজুয়াল: ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি
যদি এমন একটি বিভাগ থাকে যেখানে Rockstar সত্যিই প্রশংসার দাবিদার, সেটি হলো এর চিত্রগ্রহণ।
লোকেশন নির্বাচন, ফ্রেমিং, লাইটিং, ক্যামেরা মুভমেন্ট—সব মিলিয়ে ছবিটি দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কনসার্ট সিকোয়েন্সগুলো বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। বড় পর্দায় ছবিটি একটি স্কেল এবং গ্র্যান্ডিওর অনুভূতি তৈরি করতে সক্ষম।
অনেক দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে নির্মাতা ভিজুয়াল ভাষার ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছেন। ফলে ছবিটি নান্দনিকভাবে উপভোগ্য।
তবে সমস্যা হলো, সুন্দর ফ্রেম কখনোই দুর্বল গল্পের বিকল্প হতে পারে না।
শেষ কথা
Rockstar খারাপ চলচ্চিত্র নয়। এটি একটি আন্তরিক এবং উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি নিজের পরিচয় স্পষ্ট করতে পারেনি।
নাম Rockstar হলেও এটি একজন শিল্পীর গল্পের চেয়ে একজন প্রেমিকের গল্প বেশি। সংগীতের জগৎকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া চলচ্চিত্রটি শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক ও আবেগের নাটক হয়ে ওঠে। ফলে একজন শিল্পীর উত্থান, সৃজনশীলতা, আত্মসংকট এবং রকস্টার জীবনের জটিল বাস্তবতা যেভাবে অন্বেষণ করা যেতে পারত, তা হয়নি।
চোখ ধাঁধানো ভিজুয়াল, ভালো সংগীত এবং আন্তরিক অভিনয় থাকা সত্ত্বেও দুর্বল গল্প, অসম চিত্রনাট্য এবং ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের অভাব ছবিটিকে তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে দেয়নি।
আমার রেটিং
-
গল্প: ৪/১০
-
চিত্রনাট্য: ৫/১০
-
অভিনয়: ৬/১০
-
সংগীত: ৭/১০
-
চিত্রগ্রহণ: ৮/১০
সামগ্রিক: ৬/১০