বছর কয়েক আগের একটি জনপ্রিয় ভারতীয় ছবি “ইংলিশ ভিংলিশ” যা দেখে সকল দর্শক জেনারেশন গ্যাপ বা সন্তানের সাথে পিতা মাতার বর্তমান সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে আলোচনা শুরু করে। গল্পটি আসলেই চমৎকার।
যেখানে দেখা যায়, শশি (শ্রীদেবি) একজন উচ্চ মধ্যবিত্ত ঘরের গৃহিনী, যার স্বামী বেশ ভালো উপার্জন করেন। ছেলে ও মেয়ে বড় স্কুলে পড়ে। শশি পড়ালেখাতে কাঁচা আর ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না একেবারেই। কিন্তু শশি যা পারে তা হলো- লাড্ডু বানানো। মিহিদানার লাড্ডু বানিয়ে সে ব্যবসাও করে। নিজে পার্সেল দিয়ে আসে গ্রাহকের বাসায় তা আবার অটো রিকশাতে করে। অতএব 'ইংরেজি জানিলেই সব মুশকিল আহসান তা নহে জনাব'। শশি তার লোকাল বুদ্ধি এবং দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দিব্যি আয় করছে। কিন্তু এই মেধার মূল্য নেই সন্তানের কাছে বা স্বামীর কাছেও। সিনেমাটির বিভিন্ন সময়ে স্বামী ব্যক্তিটিকে অসম্ভব তাচ্ছিল্য নিয়ে বলতে শোনা গেছে, তোমার জন্মই হয়েছে লাড্ডু বানানোর জন্য!” বা স্ত্রী যখন বলে, ইউএসএতে তাকে সবাই “উদ্যোক্তা” বলে, তখনও ভদ্রলোকের উত্তর ছিল- ওদেরকেও লাড্ডু খাইয়েছো কিনা?
এই পুরো বিষয়টাতে পরিচালক খুব সুন্দর একটা ম্যাসেজ দিয়েছেন। ঠিক ঐ উপহাসের পরেই যখন শশি চুপ করে থাকেন, তখন স্বামী বলেন- “আরে! তুমি কী আছো? মনে হলো লাইনটা কেটে গেছে!”
এই সংলাপে আর কিছু হোক বা না হোক সম্পর্কের “ছন্দপতন” খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন পরিচালক এবং গল্পটির লেখক। আপাত দৃষ্টিতে স্বামীর কেয়ারিং এবং ভালোবাসার আড়ালে প্রকৃত পরিস্থিতিকে দিনের পর দিন শশিকে হিণমন্যতার চূড়ান্তে নিতে পারতো। কিন্তু শশি তার নিজের সীমা বাড়িয়েছে নিজে সাহস করে। একা একা আমেরিকা ভ্রমণ, রাস্তা ঘাট আবিষ্কার, ইংরেজি ক্লাসে যাওয়া- সব করেছেন । ফরাসী ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক-এর আভাস এবং নিজের অবস্থান বুঝে লাগাম টানা- এসবের মাঝ দিয়ে শশি দেখিয়েছে ইংরেজি না জানলেও তার কাছে সম্পর্ক ও তার সংরক্ষণ অনেকবেশি মূল্যবান।
কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেখানে নিজের মতামতই মূল- সেখানে তার স্বামী বরাবরই স্ত্রীকে সম্মুখে - অবচেতনে মানুষের কাছে ছোটই করেছেন। যখন শেষ মুহুর্তে তাকে কিছু বলতে বলা হয়- স্ত্রীকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই তিনি ঘোষনা দেন- শশি ইংরেজি পারে না - তাই কিছু বলবে না। শশি ঐ একটা সময় উঠে দাঁড়ায় এবং ইংরেজিতে একটি বক্তব্য দেয় বোনের মেয়ের জন্য। যার বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতেই তার আমেরিকায় আসা।
আর তারপরেই স্বামীর প্রশ্ন- তুমি কি আর আগের মত ভালোবাসো!
অর্থ্যাৎ স্বামী ব্যক্তিরা যখনই দেখে স্ত্রী দক্ষতায় বা কোনও ভাবে তার সমকক্ষ হয়ে যাচ্ছে - তখনই তার মনে ইনসিকিউরিটি চলে আসে। যেটার কোনও কারণ নেই। কারণ শশি তখনও স্বামীকে দুটো লাড্ডু দেয়। আর বাকীদের দেয় একটি করে।
সিনেমাটির অনেক জায়গায় আপাত দৃষ্টিতে সুখী শশির কিছু হতাশা দেখা যায়। বিশেস করে তখন যখন, ফরাসী ক্লাসমেট তার অনেক প্রশংসা করে আ সে দির্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে- কেউ তার প্রশংসা অনেকদিন করেনি। অথচ শশি তার জীবনটাই সাজিয়েছে অন্যের জন্যে। নিজের ইংরেজির অদক্ষতা নিয়ে কষ্ট পেয়েছে, ঠাট্টার আড়ালে নিজের অপমান হজমও করেছেন।
এই সিনেমাটিতে ইংরেজি একটা বড় অংশ হলেও, দর্শক হিসেবে আমার কাছে স্বামীর চরিত্রটি অনেক গুরুত্বপূর্ন মনে হয়েছে। নিজের চোখে দেখা অনেক স্বামী স্ত্রীকে “চাকরী করতে দেয়” কারণ স্ত্রী নিজের শাড়িটা যেন কিনতে পারে বা হাত খরচের টাকা যেন দিতে না হয়। স্ত্রীর ক্যারিয়ার নিয়ে খুব কম স্বামীই গর্ব করে। অথবা মুখের উপর বলেই দেয় “টিচার হিসেবেই তুমি ভালো, অন্য কিছু ট্রাই করার কি দরকার?” (এখানে টিচার বলা হলো রূপকার্থে)
অনেক সঙ্গী এটাও বলে, “তোমার টাকা তো সবই জমে, কি আর খরচ”।
যতই মুখে মুখে ভালো কথা বলুক, আপনার ক্যারিয়ার লাড্ডু বানানো হোক বা মার্কেটিং , যে সঙ্গী আপনার ক্যারিয়ারকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, তিনি কিন্তু আপনাকে সম্মান করে না।
আর বন্ধুদের আড্ডায় স্ত্রীকে নিয়ে মজা করা তো অন্যতম “বিখ্যাত” ফ্যাশন। বহু দেশপ্রেমিক মহান “ব্যক্তিকে” দেখেছি ভরা মজলিশে স্ত্রীর ইজ্জতের ফালুদা বানাতে । এবং স্ত্রীকে হাসতে হাসতে গলে পরে যেতে। হয়তো তার অন্যতম কারণ হয়তো স্বামীর একটা পাজেরো আছে এবং কিছু নজরকাড়া সারপ্রাইজ, যার অন্যতম আসল উদ্দেশ্য স্পেশাল আয়োজনে গান গিয়ে ভিডিও বানিয়ে অনলাইনে ফলোয়ার বাড়ানো!
নতুন বছর শুরু হয়েছে! অনেকে অনেক অঙ্গীকার নিচ্ছেন তো! আপনার সঙ্গীকে ঠিক শশির মত করে মাঝে মাঝে রুখে দিন এই সব ভালোবাসার নামে অসভ্যতা থেকে। তাকে দেখিয়ে দিন, তিনি বেশি বেতন পান বলে আপনাকে নানা ছুতোয় অসম্মান করার লাইসেন্স পাননি। তাকে বেশি বেতন দেয় সেই সব মানুষই, যারা আজও মনে করে “মেয়েজাত কম কাজ করে”। অথচ আপনি আমি শশির মতো সন্তানকে একহাতে গোছল করিয়ে ঠিকই সময়মতো লাড্ডু ডেলিভার করছি বাসায় বাসায়। ইংলিশ ভিংলিশ শুধু একটা গল্প নয়, শশির মত অনেক মেয়ের জীবনের গল্প। কিন্তু সবাইকে এমন হাসিমুখে প্রতিবাদ করতে পারে? ঠিক শশির মতই!
আর হ্যা, অনুগ্রহ পূর্বক, “আমার স্বামী করতে দেয়” এই লাস্যময়ী -হাস্যময়ী আবেগ থেকে বের হয়ে আসুন।
এই প্রতিজ্ঞা করাই যায়! তাই না?