একদিকে জীবিকা এবং অস্তিত্বের লড়াই। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতার নির্মমতা।
স্বামী-পরিত্যক্তা ও সহায়-সম্বলহীন নারী জয়গুনের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে ''সূর্য দীঘল বাড়ি'' (১৯৭৯)। তবে চলচ্চিত্রটিকে কেবল একজন নারীর দুঃখ, অভাব কিংবা বেঁচে থাকার গল্প হিসেবে দেখলে এর গভীরতর বক্তব্যটি আড়াল হয়ে যায়। কারণ জয়গুনের ব্যক্তিগত সংকট তার চেয়েও বড়। একটি প্রাচীনকাঠামোর সংকটও বটে। যেখানে নারীর শ্রম প্রয়োজন, কিন্তু তার স্বাধীনতা গ্রহণযোগ্য নয়; নারীর অস্তিত্ব স্বীকৃত, কিন্তু তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ।
আবু ইসহাকের উপন্যাসের বাস্তবতা চলচ্চিত্রে রূপ যে গুরুত্ব পেয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত জীবনের সংকটের সঙ্গে সামাজিক কাঠামো, ধর্মীয় প্রভাব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার সম্পর্কও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে দারিদ্র্য কেবল সংলাপে বলা কোনো বিষয় নয়; তা ঘর, পোশাক, চলাফেরা, খাদ্য, শ্রম এবং মানুষের সম্পর্কের ভেতর দিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে।
চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়গুন বারবার নিজের স্বাধীনতা, পরিচয় এবং অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করে। চারপাশের সামাজিক বিধিনিষেধ, দারিদ্র্য এবং পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও আত্মনির্ভরতার পথ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া সহজ হয়ে ওঠে না। একজন শক্তিশালী নারী চরিত্র কীভাবে নির্মিত হতে পারে, সত্তরের দশকের চলচ্চিত্রে তার একাধিক উদাহরণ পাওয়া যায়।
তবে এখানেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে, চলচ্চিত্রের পর্দায় কয়েক দশক আগে যে নারীকে এতটা সংগ্রামী, আত্মনির্ভর এবং সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে নারীর চরিত্র কীভাবে ক্রমশ রূপ, শরীর এবং নির্ভরশীলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল?
কেন্দ্রীয় চরিত্র বিশ্লেষণের আগে চলচ্চিত্রটির পারিপার্শ্বিকতাকে একটু অনুবীক্ষণ করা প্রয়োজন।
প্রথমেই আসে পোশাকের প্রসঙ্গ। বাঙালি নারীর পোশাকের ইতিহাসকে বর্তমানের ‘সংস্কৃতি’ ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বেশ কিছু বৈপরীত্য সামনে আসে। সূর্য দীঘল বাড়ির নারীদের পোশাক সেই সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার একটি দলিল হিসেবেও কাজ করে। অথচ বর্তমান সময়ে ‘সংস্কৃতি রক্ষা’র নামে নারীর পোশাকের ওপর অসংখ্য বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। মাথা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ঢেকে রাখাকে অনেক সময় সংস্কৃতির একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
কিন্তু সংস্কৃতি কি কেবল নারীর শরীর ঢেকে রাখার নাম?
অতীতকে না জেনে, ইতিহাসকে না পড়ে এবং নিজেদের সামাজিক বাস্তবতাকে গবেষণার মাধ্যমে না বুঝে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির ব্যবহার কতটা অর্থবহ, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। অতীতের চলচ্চিত্রগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ পোশাক, ভাষা, আচরণ, সম্পর্ক এবং সামাজিক রীতিনীতির মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সমাজবাস্তবতা পর্দায় সংরক্ষিত হয়ে থাকে।
চলচ্চিত্রটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারীদের ধূমপানকে উপস্থাপনের ধরন। সেখানে ধূমপানকে আলাদা করে কোনো নৈতিক অবক্ষয়ের চিহ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। নারী ধূমপান করছে—দৃশ্যের মধ্যে সেটি স্বাভাবিক একটি আচরণ হিসেবেই উপস্থিত হয়েছে। তাকে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, তার চেহারা কিংবা পোশাকের সঙ্গে ধূমপানকে যুক্ত করে কোনো ‘খারাপ নারী’র ছকও তৈরি করা হয়নি।
পরবর্তী সময়ের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অবশ্য ছোট চুল, ধূমপান কিংবা প্রচলিত পোশাকের বাইরে থাকা নারীকে প্রায়ই নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ চরিত্র হিসেবে নির্মাণ করতে দেখা গেছে। ফলে বিষয়টি শুধু ধূমপানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং প্রশ্ন উঠে আসে, একজন নারী কী করতে পারবে, কীভাবে পোশাক পরবে, কেমন দেখতে হবে কিংবা কীভাবে নিজের জীবন পরিচালনা করবে, এসবের সঙ্গে তার নৈতিক চরিত্রের সম্পর্ক তৈরি করা হলো কীভাবে?
চলচ্চিত্রটির শক্তিশালী দিকগুলোর একটি হলো সংলাপের মধ্য দিয়ে সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরা।
জয়গুন যখন ট্রেনে করে ময়মনসিংহ যাচ্ছিল, তখন একজন কৃমির বড়ি বিক্রি করছিল। বড়িটির নাম ছিল ‘পাকিস্তানি বড়ি’। এক ব্যক্তি মন্তব্য করলেন, লোকটি ব্যবসা বোঝে—কৃমির বড়ির নাম দিয়েছে পাকিস্তানি বড়ি। এরপর হিন্দুয়ানি নাম পরিবর্তন করা উচিত কি না, পাকিস্তান হলে কী পরিবর্তন আসবে, কিংবা মুসলমানদের নিজেদের দেশ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এসব নিয়ে কথোপকথন শুরু হলো।
কিন্তু সেই রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেও সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে উঠে এলো জিনিসপত্রের দাম। পাকিস্তান হলে অন্তত জিনিসপত্রের দাম কমবে—এমন প্রত্যাশাও প্রকাশ করা হলো।
এই সংলাপ কেবল দেশভাগ বা পাকিস্তান আন্দোলনের রাজনৈতিক ইতিহাসকে ধারণ করে না; সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনা, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে প্রত্যাশার মধ্যকার সম্পর্কও প্রকাশ করে।
এর পরেই ট্রেনে লেখা দেখা যায়, ‘দশ জন বসিবেন।’
চলচ্চিত্রের ভাষার শক্তি এখানেই। কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, দীর্ঘ বক্তব্য রাখা হয়নি। একটি ছোট্ট দৃশ্যের মধ্য দিয়েই মানুষের জায়গার সংকীর্ণতা, অতিরিক্ত বোঝা এবং বাস্তব জীবনের সীমাবদ্ধতার একটি ইঙ্গিত তৈরি করা হয়েছে।
চলচ্চিত্রকার যা বলতে চান, তা সবসময় সংলাপের মাধ্যমে বলতে হয় না। কখনো একটি দৃশ্যই একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
এবার জয়গুনের দিকে ফিরে আসা যাক।
জয়গুন কেবল তাঁর সময়ের নারীদের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তাঁর সংগ্রামের সঙ্গে আজকের নারীদের অভিজ্ঞতারও মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নারীর সংগ্রাম নতুন কোনো বিষয় নয়। সামাজিক কাঠামোর শুরু থেকেই নারীর শ্রম, শরীর, চলাফেরা, সিদ্ধান্ত এবং স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলে এসেছে।
জয়গুনের ক্ষেত্রেও ধর্ম ও শরিয়তের ব্যাখ্যাকে ব্যবহার করে গ্রামের মসজিদের ইমাম এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাকে কাজ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। তাকে তওবা করানো হয়, যাতে গ্রাম থেকে বের হয়ে কাজ করা বন্ধ করা যায়। কিন্তু এখানে কেবল ধর্মীয় বিধিনিষেধের প্রশ্ন দেখলে বিষয়টির গভীরতর ক্ষমতার কাঠামোটি অনালোচিত থেকে যায়।
কারণ প্রশ্নটি দাঁড়ায়, জয়গুনকে কাজ করতে দেওয়া হবে না কেন?
একজন নারী কাজ করলে তার নিজের আয় তৈরি হয়। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়। নিজের এবং পরিবারের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বাড়ে। ফলে তার ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ জয়গুনকে কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা কেবল তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নয়; তার আত্মনির্ভরশীলতা ভেঙে দেওয়ারও চেষ্টা।
এই জায়গাতেই সূর্য দীঘল বাড়ি বর্তমানের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরি করে। সময় বদলেছে, নিয়ন্ত্রণের ভাষা বদলেছে, সামাজিক কাঠামোর প্রকাশভঙ্গি বদলেছে—কিন্তু নারীর স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা কতটা বদলেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
আজ হয়তো প্রকাশ্যে তওবা করানোর ঘটনা কম দেখা যায়। কিন্তু নারীর পোশাক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কাজ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, রাতে বাড়ি ফেরার সময় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, নিজের অর্থ উপার্জন কিংবা নিজের জীবন নিজের মতো করে পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
নিয়ন্ত্রণের ভাষা বদলেছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা কি বদলেছে?
জয়গুনের সংগ্রাম থেমে যায় না। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য সামাজিক বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে থাকে সে। এই সংগ্রাম কোনো বিমূর্ত ‘নারীমুক্তি’র বক্তৃতা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ভাতের নিশ্চয়তা, সন্তানের নিরাপত্তা, নিজের জীবিকা এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন।
আর যখন তাকে থামানোর অন্য কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না, তখন জয়গুনের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এই আগুন শুধু একটি বাড়ি পোড়ায় না। একজন নারীর স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে পুড়িয়ে দেওয়ার সামাজিক প্রচেষ্টার প্রতীক হয়ে ওঠে।
তবু এখানেই সূর্য দীঘল বাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে,
একজন নারীকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে না দেওয়ার জন্য একটি সমাজ কতদূর যেতে পারে?
আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এত বছর পরও সেই সমাজ থেকে কতটা দূরে সরে আসা সম্ভব হয়েছে?