সময়টা ছিল বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ, একবিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিনগুলো। বলিউডে তখন রোমান্টিক মেলোড্রামার স্বর্ণযুগ চলছে। Hum Aapke Hain Koun..!, Dilwale Dulhania Le Jayenge, Kuch Kuch Hota Hai — এসব সিনেমা শুধু জনপ্রিয়ই ছিল না, বরং তরুণ প্রজন্মের লাইফস্টাইল, প্রেম আর আবেগের বড় এক অংশ হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে দেশাত্মবোধক অ্যাকশন ঘরানায় Gadar: Ek Prem Katha ও Border ছিল দর্শকদের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।
ততদিনে সমসাময়িক প্রায় সব তারকাকে জনপ্রিয়তা ও বক্স অফিস—দুই দিক থেকেই ছাড়িয়ে বলিউড তথা পুরো উপমহাদেশের সিনেমার শীর্ষে উঠে গেছেন Shah Rukh Khan। তখনকার অনেক মানুষের কাছে নস্টালজিয়া মানেই ছিল শাহরুখ খান।
সেই সময় সিনেমা ছিল পুরোপুরি পারিবারিক বিনোদনের মাধ্যম। পরিবারের সবাই মিলে বসে টিভিতে সিনেমা দেখা কিংবা একসাথে সিনেমা হলে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক সংস্কৃতি। পশ্চিমা দেশের মতো বন্ধুদের দলবেঁধে সিনেমা দেখা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভিউয়িং কালচার তখনও এই উপমহাদেশে তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। এর অন্যতম কারণ ছিল বলিউডের মূলধারার সিনেমাগুলোর পরিবারকেন্দ্রিক নির্মাণশৈলী।
ঠিক এই সময়েই মুক্তি পায় Dil Chahta Hai। সিনেমাটি যেন হঠাৎ করেই বলিউডে নতুন এক বাতাস নিয়ে আসে। শহুরে তরুণদের বন্ধুত্ব, মানসিক টানাপোড়েন, সম্পর্কের জটিলতা, আত্মপরিচয়ের সংকট—এসব বিষয় এত বাস্তবভাবে আগে খুব কম সিনেমাতেই দেখা গিয়েছিল। বাবা-মায়ের সাথে থাকা আর নিজের মতো করে আলাদা জীবন গড়ে তোলার অনুভূতির পার্থক্যও সিনেমাটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছিল।
নির্মাতা Shakun Batra এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—
“For me as a young viewer, films were purely for entertainment. But this film spoke to me more clearly about what I was feeling the idea of being lost, unsure and it made me feel better about that. I didn’t know movies could speak to me like that.”
মূলধারার পরিবারকেন্দ্রিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে এমন এক ভিন্ন স্বাদের সিনেমায় অভিনয় করার সিদ্ধান্ত ছিল Aamir Khan-এর ক্যারিয়ারের অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ। মূলত এই সময় থেকেই বলিউডে “ফিল-গুড” ও গল্পনির্ভর সিনেমা নির্মাণের প্রতি নির্মাতাদের আগ্রহ বাড়তে শুরু করে।
এরপর আসে Lagaan যা সেই পরিবর্তনের আরও পরিণত ও বিস্তৃত রূপ। এর আগে বলিউডে দেশাত্মবোধক সিনেমা বলতে মূলত ইন্দো-পাক যুদ্ধভিত্তিক গল্পই বেশি দেখা যেত। কিন্তু Lagaan সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু করেছিল। ঔপনিবেশিক ভারতের প্রেক্ষাপটে ক্রিকেট, রাজনৈতিক নিপীড়ন, প্রেম, সংগ্রাম আর উচ্চমাত্রার নাটকীয়তাকে একসাথে মিশিয়ে সিনেমাটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
ব্রিটিশদের অন্যায় করব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদেরই খেলা ক্রিকেটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ধারণাটা দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ক্রিকেট, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আর আত্মমর্যাদার লড়াই এই তিনের সংমিশ্রণ সিনেমাটিকে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। বাণিজ্যিকভাবেও এটি ছিল বিশাল সফল। প্রায় ২৫ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৬৫–৭০ কোটি রুপি আয় করে, যা সেই সময়ের বলিউডের জন্য ছিল বিশাল অর্জন। আন্তর্জাতিক বাজারেও সিনেমাটি ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং পরে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে ( OSKAR) Best Foreign Language Film বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে বিশ্বজুড়েও আলোচনায় আসে।
অন্যদিকে Dil Chahta Hai শুরুতে মূলত শহুরে ও মাল্টিপ্লেক্সকেন্দ্রিক দর্শকদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয়তা পেলেও ধীরে ধীরে এটি কাল্ট ক্লাসিকে পরিণত হয়। প্রায় ১২–১৩ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৩৮–৪০ কোটি রুপি আয় করে। বন্ধুত্ব, আধুনিক সম্পর্ক আর তরুণদের জীবনধারাকে এত স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরার কারণে সিনেমাটি বিশেষ করে শহুরে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তীতে বলিউডের আধুনিক 'coming of age' ধারার সিনেমাগুলোর পথপ্রদর্শক হিসেবেও এটি স্বীকৃতি পায়।
মজার বিষয় হলো, Dil Chahta Hai এবং Lagaan এই দুই সিনেমাতেই মূলধারার প্রায় সব উপাদান ছিল: রোমান্স, কমেডি, আবেগ, নাটকীয়তা, দেশাত্মবোধ সবই। কিন্তু গল্প বলার ধরণ, নির্মাণশৈলী, চরিত্রের গভীরতা এবং কারিগরি উপস্থাপনায় তারা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা মাত্রার। এই দুই সিনেমা প্রমাণ করে দিয়েছিল, মূলধারার দর্শকদের জন্যও গল্পনির্ভর ও ভিন্নধারার সিনেমা তৈরি সম্ভব এবং সেটিও সমানভাবে জনপ্রিয় হতে পারে।
এই দুই সিনেমার পর থেকেই দেখা যায় Aamir Khan অনেক বেছে বেছে সিনেমা করতে শুরু করেন এবং গল্প ও নির্মাণমানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। পরবর্তীতে তার “Mr. Perfectionist” পরিচয়ের পেছনে এই দৃষ্টিভঙ্গির বড় ভূমিকা ছিল। তবে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, Dil Chahta Hai এবং Lagaan পুরো বলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারাই বদলে দিয়েছিল এটা বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না।