একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমায় ‘হিরো’ মানে ছিল খুব নির্দিষ্ট একজন মানুষ।
তিনি আত্মবিশ্বাসী হবেন
স্টাইলিশ হবেন
শেষ দৃশ্যে জিতবেন
ভালোবাসা পাবেন
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তিনি দর্শকের বাস্তব জীবনের চেয়ে বড় হবেন(larger than life).
ভারতে Shah Rukh Khan, Salman Khan, Ajay Devgn কিংবা Hrithik Roshan যেমন এই larger than life hero image এর প্রতীক ছিলেন, তেমনি বাংলাদেশে Salman Shah, Riaz, Shakib Khan বা পরে Arifin Shuvoo নিজেদের সময়ের mass hero persona তৈরি করেছিলেন।
এই সময় সিনেমা মূলত escapism এর জায়গা ছিল। মানুষ বাস্তব জীবনের ক্লান্তি ভুলতে সিনেমা দেখত। যা প্রকৃতপক্ষে এখনও চলমান।
কিন্তু ২০১৭-১৮ থেকে OTT আসার পর এই পুরো ধারণাটাই ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।
যখন পর্দার নায়ক ধীরে ধীরে বাস্তব মানুষের মতো হয়ে উঠল
Netflix, Hoichoi, Chorki-সহ বিভিন্ন streaming platform দক্ষিণ এশিয়ার দর্শকদের শুধু নতুন content এর সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেয়নি বরং পুরো viewing culture এর ভিত্তিটাই বদলে দিয়েছে। একসময় মানুষ কী দেখবে, তা অনেকটাই নির্ধারণ করে দিত TV channel, cinema hall কিংবা satellite network। শুক্রবারের নতুন release কিংবা রাতের টেলিভিশনের নির্দিষ্ট সময়সূচির বাইরের পৃথিবীটা অধিকাংশ দর্শকের কাছেই ছিল সীমিত।
OTT আসার পর সেই সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রথমবারের মতো content বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পুরোপুরি চলে আসে দর্শকের হাতে। এখন একজন দর্শক একই রাতে হয়তো Delhi Crime, Karagar, Mohanagar কিংবা কোনো Korean thriller দেখে ফেলছেন! ভাষা, দেশ বা genre এর সীমা ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাতে শুরু করে দর্শকের storytelling সম্পর্কিত প্রত্যাশাও। তারা আর শুধু সেই অপরাজেয়, larger than life নায়কের গল্প খুঁজছে না, যে একা দশজনকে হারিয়ে দেয়, প্রতিটি সমস্যার সমাধান জানে এবং শেষ দৃশ্যে অনিবার্যভাবে জয়ী হয়! বরং দর্শক আকৃষ্ট হতে শুরু করল এমন চরিত্রের দিকে, যারা ভুল করে, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, সিদ্ধান্তহীনতায় দুলতে থাকে আবার অনেক সময় নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ঠিক যেন দর্শক নিজেকেই পর্দায় দেখছেন! কারণ তারা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছেন, perfection এর চেয়ে authenticity অনেক বেশি শক্তিশালী।
পর্দার নায়ক এখন ভয় পায় আবার ভুলও করে
OTT যুগের সবচেয়ে গভীর পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই লুকিয়ে আছে। একসময় mainstream গল্পের নৈতিক কাঠামো ছিল সরল ও দ্বন্দ্বহীন। নায়ক মানেই ভালো মানুষ, খলনায়ক মানেই খারাপ। দর্শক আগে থেকেই জানত কাকে ভালোবাসতে হবে, কাকে ঘৃণা করতে হবে।
OTT সেই চিরচেনা বিভাজনটাকেই ধীরে ধীরে ভেঙে দিয়েছে। এখন দর্শক সাদরে গ্রহণ করছে morally grey চরিত্রগুলোকে যারা সম্পূর্ণ ভালো নয়, আবার পুরোপুরি খারাপও নয়। Sacred Games এর Sartaj Singh মানসিকভাবে ক্লান্ত, ক্রমাগত অনিশ্চিত এবং নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নিদারুণভাবে সচেতন। Paatal Lok এর Hathiram Chaudhary হতাশ, ব্যর্থ এবং একেবারেই সাধারণ একজন মানুষ। Farz’‘র Sunny একজন জালিয়াত, তবু তার ভেতরের insecurity, অদম্য ambition আর emotional vulnerability তাকে একইসঙ্গে করে তোলে গভীরভাবে relatable।
বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন সমান স্পষ্ট। Karagar-এর রহস্যময় কয়েদি কিংবা Mohanagar-এর OC Harun কেউই প্রচলিত অর্থে নায়ক নন। তারা নৈতিকভাবে জটিল, স্ববিরোধী এবং বহু সিদ্ধান্তে morally questionable। তবু দর্শক তাদের সঙ্গেই সবচেয়ে গভীরভাবে connect করেছে। কারণ এই চরিত্রগুলো বাস্তব মানুষের প্রতিচ্ছবি, ভাঙাচোরা, দ্বিধাগ্রস্ত এবং অসম্পূর্ণ।
এটাই হয়তো OTT যুগের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি। পর্দা এখন আর স্বপ্ন দেখায় না, নিজেকে চেনায়।
Star নয়, Script-ই এখন আসল নায়ক
একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমা পুরোপুরি star system এর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
নায়কের entry, dialogue, dance, fight এসবই ছিল সিনেমার মূল আকর্ষণ। গল্প মাঝারি হলেও তারকার উপস্থিতি দর্শককে টেনে আনত, হল ভরিয়ে রাখত। গল্প ছিল অনেকটা অজুহাতের মতো। যা প্রকৃতপক্ষে Star’কে দেখানোর একটা কাঠামো মাত্র।
OTT সেই ভারসাম্যটা বদলে দিয়েছে। এখন দর্শক কোনো Movie/Series শুরু করার আগে প্রথমে যা জানতে চায়, গল্পটা কেমন, চরিত্রগুলো বিশ্বাসযোগ্য কিনা। অভিনেতার নাম আসে তারপর। পরিচিত মুখ না থাকলেও ভালো গল্প দর্শককে শেষ পর্যন্ত Screen এর সামনে ধরে রাখে। আর দুর্বল চিত্রনাট্য বড় তারকাকেও রক্ষা করতে পারে না।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ হলো চরিত্র অভিনেতাদের (Character Actor) নতুন উত্থান। Nawazuddin Siddiqui, Jaideep Ahlawat, Manoj Bajpaye কিংবা বাংলাদেশের Mosharraf Karim, Chanchal Chowdhury, Fazlur Rahman Babu। যাদের একসময় ‘just character actor’ বলে পাশে সরিয়ে রাখা হতো, OTT তাদেরই করেছে গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের Method Acting এখন নতুনভাবে massive audience acceptance পাচ্ছে। কারন এখন charisma’র চেয়ে performance, আর stardom এর চেয়ে character depth অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Ordinary মানুষদের গল্পই এখন নতুন Heroism তৈরি করছে
পুরোনো mainstream সিনেমাগুলোতে urban glamour ছিল অত্যন্ত dominant। বড় শহরের stylish lifestyle, polished character, fashionable romance এসবই দীর্ঘসময় দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রিয় storytelling এর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ছিল।
কিন্তু OTT এসে সেই cinematic focus টাকেই বদলে দেয়। ছোট শহর, মফস্বল, এমনকি গ্রামীণ বাস্তবতাও ধীরে ধীরে storytelling এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। Paatal Lok, Panchayat, Mirzapur যেমন ভারতের ছোট শহরের মানুষদের জীবন, ভাষা ও বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের narrative তৈরি করেছে, তেমনি বাংলাদেশের Mohanagar, Syndicate কিংবা Unoloukik polished urban heroism থেকে সরে এসে অনেক বেশি grounded এবং relatable চরিত্র সামনে এনেছে।
এই পরিবর্তনের ফলে hero-র সংজ্ঞাটাও বদলাতে শুরু করে।এখন hero মানে শুধু stylish বা larger than life কেউ নয়। Hero মানে এমন একজন মানুষ, যার গল্প দর্শক বিশ্বাস করতে পারে।
Changing Masculinity: এখন Hero কাঁদে, ভয়ও পায়
একসময় দক্ষিণ এশিয়ার পর্দায় পুরুষত্বের সংজ্ঞা ছিল মূলত শারীরিক। Fight. Power. Aggression. আবেগ দেখানো ছিল দুর্বলতার লক্ষণ, কাঁদা ছিল অসম্মানের। নায়ককে সবসময় অবিচল থাকতে হতো — ভেতরে যা-ই হোক, বাইরে সে অটল।
OTT সেই ধারণাটাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিয়েছে। Made in Heaven-এর পুরুষ চরিত্রগুলো emotionally fragile, নিজেদের সংকট নিয়ে প্রকাশ্যে লড়াই করে। Kohrra-র পুলিশ অফিসাররা শুধু তদন্তকারী নন, তারা deeply broken মানুষ, যাদের ব্যক্তিগত ক্ষত গল্পের সমান গভীর। বাংলাদেশের OTT content এও পুরুষ চরিত্রদের anxiety, একাকিত্ব আর insecurity এখন অনেক বেশি খোলামেলাভাবে উঠে আসছে। Mohanagar এর OC Harun ক্ষমতাবান হলেও ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত, চাপে ভাঙা এবং morally conflicted একজন মানুষ।
এই পরিবর্তনটা শুধু গল্প বলার ধরনের নয় এখন এটা সাংস্কৃতিক। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমায় এতদিন পুরুষের emotional strength ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক। সেই জায়গায় OTT বলছে hero কাঁদতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে। ভুল করতে পারে। তবুও সে hero।
নারী চরিত্রও এখন গল্পের কেন্দ্রবিন্দু
OTT শুধু পুরুষ চরিত্রের সংজ্ঞা বদলায়নি সাথে নারীর গল্প বলার জায়গাটাও নতুন করে তৈরি করেছে।
একসময় দক্ষিণ এশিয়ার মূলধারার সিনেমায় নারী চরিত্র অনেকটা পরিপূরক ভূমিকায় থাকত নায়কের অনুপ্রেরণা, তার আবেগের আশ্রয়, কিংবা গল্পের সৌন্দর্যবর্ধনের উপকরণ। তার নিজস্ব সংকট থাকত না, স্বাধীন সিদ্ধান্ত থাকত না। গল্প এগিয়ে যেত তার জন্য কিন্তু তাকে দিয়ে নয়।
OTT সেই জায়গাটা মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। ভারতে Delhi Crime, Darlings, Leila, Aarya এই কাজগুলো এমন নারী চরিত্র তৈরি করেছে যারা জটিল, স্ববিরোধী এবং নিজেদের গল্পের পূর্ণ মালিক। তারা ভাঙে, সামলায়, লড়াই করে এবং সেই লড়াইয়ে কোনো পুরুষের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশেও Sabrina, Mubashshir, Buker Moddhye Agun এর মতো কাজ নারী চরিত্রকে দিয়েছে নতুন গভীরতা। তারা আর শুধুই react করে না সিদ্ধান্তও নেয়। ভুল করে, দায় বহন করে এবং নিজের শর্তে এগিয়ে যায়।
এই পরিবর্তনটা কেবল representation এর নয় এটা narrative power এর। এখন নারী চরিত্র শুধু গল্পের অংশ নয়, সে গল্পের চালিকাশক্তি। এবং দর্শক সেই শক্তির সঙ্গে connect করছে কারণ এই চরিত্রগুলো তাদের পরিচিত, তাদের নিজেদের জীবনের প্রতিফলন।
এখন কি গল্প Superstar-এর চেয়েও বড়?
পুরোপুরি না।
ভারতে Shah Rukh Khan-এর Pathaan কিংবা Jawan, আর বাংলাদেশে Shakib Khan এর Borbaad বা Tandob-এর massive theatrical pull এখনও প্রমাণ করে cinema hall culture পুরোপুরি star charisma থেকে সরে আসেনি। বড় পর্দায় তারকার উপস্থিতি এখনও অনেক দর্শকের কাছে এক ধরনের event, collective excitement এবং spectacle-এর অভিজ্ঞতা।
তবে OTT একটা বিষয় খুব স্পষ্ট করে দিয়েছে। বড় পর্দায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আর OTT তে দীর্ঘ সময় ধরে দর্শককে screen এর সামনে ধরে রাখা এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা চ্যালেঞ্জ। তারকার নাম হয়তো প্রথম এপিসোড দেখাতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ এপিসোড পর্যন্ত দর্শককে টেনে রাখে গল্প। শুধু stardom দিয়ে সেই দূরত্ব পার করা কঠিন।
আজকের দর্শক content সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সে তুলনা করতে জানে, বিচার করতে জানে এবং পছন্দ না হলে সরে যেতেও দ্বিধা করে না।
Hero এখন আর দূরের কেউ নয়, আমাদেরই একজন
হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
একসময় hero মানে ছিল এমন একজন, যাকে মানুষ হতে চায়। দূরের, অধরা, অসাধারণ, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। তাকে দেখা যেত, অনুভব করা যেত না।
এখন সেই সংজ্ঞা বদলে গেছে। আজকের hero এমন একজন, যাকে মানুষ বুঝতে পারে। তিনি imperfect হতে পারেন, mentally exhausted হতে পারেন, নৈতিকভাবে ambiguous হতে পারেন। তাঁর ভেতরে দ্বন্দ্ব আছে, ব্যর্থতা আছে, না-বলা কষ্ট আছে। তবুও সেই অসম্পূর্ণতার কারণেই তিনি এখন বেশি relatable।
কারণ OTT যুগে দক্ষিণ এশিয়ার দর্শক ধীরে ধীরে spectacle এর চেয়ে honesty বেশি খুঁজতে শুরু করেছে। তারা এখন আর পর্দায় শুধু অজেয় মানুষ দেখতে চায় না বরং এমন কাউকে খোঁজে, যার ভেতরে নিজেদের ভয়, ক্লান্তি, insecurity কিংবা অপূর্ণতার প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায়।
আর সম্ভবত এই কারণেই আজকের hero আগের চেয়ে অনেক বেশি মানবিক।