অদৃশ্য সিম্ফনি: বাংলাদেশের সিনেমায় সাউন্ড ডিজাইনের নতুন ভাষা

অদৃশ্য সিম্ফনি: বাংলাদেশের সিনেমায় সাউন্ড ডিজাইনের নতুন ভাষা

Nov 01, 2025
22 views
<p>Sound Design</p>

 অদৃশ্য সিম্ফনি: বাংলাদেশের সিনেমায় সাউন্ড ডিজাইনের নতুন ভাষা

অরিত্র জলধি

সিনেমা দেখা মানে শুধু পর্দায় কিছু ছবি দেখা নয় এটা এক অভিজ্ঞতা। একটি শব্দ, একটি নিশ্বাস, একটি দরজার কড়ার আওয়াজ এগুলোই নির্ধারণ করে আমরা সেই অভিজ্ঞতা কতটা গভীরভাবে অনুভব করব।

বাংলাদেশি সিনেমায় একসময় সাউন্ড ডিজাইন মানে ছিল সংলাপ পরিষ্কার রাখা আর সংগীত জোরে বাজানো।
কিন্তু এখন সময় বদলেছে। নতুন প্রজন্মের পরিচালক, সাউন্ড ডিজাইনার, সংগীত পরিচালক এবং মিক্স ইঞ্জিনিয়াররা বুঝতে শুরু করেছেন

‘শব্দ শুধু সহায়ক নয়, শব্দই গল্পের আত্মা’

শব্দ: গল্পের অদৃশ্য চরিত্র

সাউন্ড ডিজাইন মানে কেবল ব্যাকগ্রাউন্ড নয়। এটি আবেগ, পরিবেশ, মুড— সব কিছুর সংমিশ্রণ।

তারেক মাসুদের মাটির ময়না এখনো উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। নদীর ঢেউ, বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, দূরের আজানের আওয়াজ সব মিলিয়ে দর্শক যেন ছবির ভেতরে প্রবেশ করে।

অন্যদিকে, গিয়াস উদ্দিন সেলিমের মনপুরা র সাউন্ডস্কেপ দেখায় কীভাবে নীরবতা পর্যন্ত ব্যবহার করা যায় আবেগের প্রকাশে। সেই নিস্তব্ধ দ্বীপে শুধু চরিত্রদের নয়, শব্দগুলোকেও একাকী মনে হয়।

আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর Saturday Afternoon (শনিবার বিকেল) একটানা শটে নির্মিত এই ছবিতে প্রতিটি নিশ্বাস, গুলির প্রতিধ্বনি, দরজার শব্দ বাস্তবতার এক ভয়ানক উপস্থিতি তৈরি করেছে।
এ যেন শব্দ নিজেই এক চরিত্র
, এক জীবন্ত ভয়ের প্রতীক।

নতুন যুগ: শব্দের বিপ্লব

বাংলাদেশি সিনেমার নতুন ধারা— তাণ্ডব, বরবাদ, তুফান— এই ছবিগুলো শুধু দৃষ্টিতে নয়, শ্রবণেও এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।

তাণ্ডব (2024)

রায়হান রাফির তাণ্ডব-এ সাউন্ড ডিজাইন ছিল সিনেমার মেইন এট্রাকশন।
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিশৃঙ্খল পরিবেশে মিক্সিংয়ের তীব্রতা, রাস্তায় মোটরসাইকেলের প্রতিধ্বনি, বৃষ্টির শব্দ, এবং নীরবতার মুহূর্তগুলো মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক দমবন্ধ বাস্তবতা। এখানে সাউন্ড কেবল পরিবেশ নয় এটি চরিত্রের মানসিক অবস্থা প্রকাশের এক মাধ্যম।

বরবাদ (2025)

মেহদী হাসান হৃদয়ের বরবাদ  ছিল বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম সিনেমায় সাউন্ডের এক নতুন পরীক্ষা।
অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে প্রতিটি ঘুষির শব্দ, গাড়ির স্ক্র্যাচ, বিস্ফোরণ এবং তারপর হঠাৎ নীরবতা দর্শকের অ্যাড্রেনালিন বাড়িয়ে দিয়েছে। সিনেমার সাউন্ড মিক্সিং ছিল আন্তর্জাতিক মানের, যা প্রমাণ করে এখন বাংলাদেশেও ব্লকবাস্টার সিনেমায় সাউন্ড ডিজাইনকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

তুফান (2024)

হালকা মিউজিকাল উপাদান, বাস্তব অ্যাকশন, আর আবেগের মিশেলে তুফান এর সাউন্ড ছিল ব্যালেন্সড।
বজ্রপাতের শব্দ, বৃষ্টির ছন্দ, আর শাকিব খানের চরিত্রের আবেগী মুহূর্তে নরম ব্যাকগ্রাউন্ড এইসব সূক্ষ্ম ডিজাইন গল্পের মুডকে শক্তিশালী করেছে।

নতুন প্রজন্মের সাউন্ড ডিজাইনারদের উত্থান

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে এখন এমন এক সময় এসেছে, যেখানে তরুণ শিল্পীরা শব্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভয় পান না। তারা বুঝেন, শব্দের মাধ্যমেই গল্প আরও “জীবন্ত” হয়।

আরফাত মোহসিন: Architect of Emotions

আরফাত মোহসিন মূলত সংগীত পরিচালক হিসেবে পরিচিত হলেও এখন চলচ্চিত্রের সাউন্ড ডিজাইনে তিনি এক অনন্য নাম।
Networker Baire, Raat Jaga Phool কিংবা Friday–এর মতো কাজগুলোতে তিনি দেখিয়েছেন,
কীভাবে বাস্তব শব্দ (ambient noise) ও সংগীতের মিশ্রণ দিয়ে আবেগের গভীরতা তৈরি করা যায়।
তার সাউন্ডস্কেপে প্রতিটি শব্দের জায়গা আছে, একটি গাড়ি দূরে চলে যাওয়ার আওয়াজও যেন চরিত্রের একাকিত্বের একটি প্রতীক হিসবে স্ট্যাবিলিশড হয়ে যায়
।

প্রীতম হাসান: শব্দ আর সুরের মিশ্রশিল্পী

প্রীতম হাসান একদিকে সংগীতশিল্পী, অন্যদিকে আধুনিক চলচ্চিত্র সাউন্ডের পরীক্ষক।
উনপঞ্চাশ বাতাস (Unoponchash Batash) ও (তিথির অসুখ) Tithir Oshukh–এর মতো ছবিতে তিনি সংগীত ও সাউন্ড ডিজাইনকে একসাথে বুনেছেন। তার কাজের বৈশিষ্ট্য হলো,  তিনি কখনো সাউন্ডকে সুরে রূপ দেন, আবার কখনো সুরকেই শব্দে পরিণত করেন। এভাবে তিনি বাংলাদেশের সিনেমায় “সাউন্ড ডিজাইনার” শব্দটিকে এক নতুন অর্থ দিয়েছেন

“শব্দ দিয়ে গল্প বলা, সুর দিয়ে চরিত্র ফুটিয়ে তোলা”

 

শব্দের জগতে প্রযুক্তি ও চ্যালেঞ্জ

সাউন্ড ডিজাইন মানে শুধুই সৃজনশীলতা নয় এটা এক উচ্চ প্রযুক্তির বিষয়ও।
ভালো মাইক্রোফোন, রেকর্ডিং রুম, সাউন্ডপ্রুফ স্টুডিও, আর দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া মানসম্পন্ন সাউন্ড তৈরি সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে এখনো অনেক সিনেমা সীমিত বাজেটে তৈরি হয়, ফলে সাউন্ড ডিজাইনে বিনিয়োগ কম হয়।
কিন্তু পরিবর্তনটা এসেছে তরুণদের হাত ধরে।
তারা নিজের ল্যাপটপে Pro Tools, Logic Pro, Reaper এর মতো সফটওয়্যার ব্যবহার করে সিনেমাটিক মানের সাউন্ড বানাচ্ছেন। কেউ রাস্তায় গিয়ে ফিল্ড রেকর্ড করছে, কেউ শহরের আওয়াজ রূপান্তর করছে ভয়েস ডিজাইনে।

এই প্রজন্মের মানুষরা বিশ্বাস করেন
 “শব্দই সিনেমার হৃদস্পন্দন।”

ভবিষ্যৎ: যেখানে শব্দই গল্প বলে

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশনের যুগে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখন এক বৈশ্বিক পরিসরে প্রবেশ করছে। এই সময়ের সিনেমায় সাউন্ড ডিজাইন শুধু প্রফেশনাল চাহিদা নয়, বরং নান্দনিক প্রয়োজন।

যেমন—

  • মায়ার জঞ্জাল (Mayar Jonjal) এর সাউন্ডস্কেপ শহরের নিঃশব্দ হতাশা প্রকাশ করে।
  • Something Like an Autobiography–এ প্রতিটি ঘরের আওয়াজ চরিত্রের মনের ভেতরের নীরবতাকে প্রতিফলিত করে।
  • Patalghor বা Birkontto–র মতো স্বাধীন সিনেমায় সাউন্ড ডিজাইনাররা গল্পের সীমা ভেঙে দিচ্ছেন— যেখানে নীরবতাই হয়ে উঠছে সংলাপ।

শেষ কথা: এখন শোনার সময়

বাংলাদেশি সিনেমা এখন নিজস্ব শব্দে কথা বলছে। আগে যেটা “পেছনের কাজ” বলে অবহেলা করা হতো, সেটাই এখন “গল্পের প্রাণ” হয়ে উঠছে।

সাউন্ড ডিজাইনের এই পুনর্জাগরণ শুধু প্রযুক্তির কারণে নয় এটা এক প্রজন্মের শিল্পীদের দৃষ্টিভঙ্গির ফল, যারা বিশ্বাস করেন:

“শব্দও গল্প বলে, যদি তুমি মন দিয়ে শোনো।”

22 views
How did this make you feel?

Reader Reviews

0 (0 reviews)

Rate & Review

5.0 /10

No reviews yet. Be the first to review!

Film Fiesta Newsletter

Stay in the Loop with Film Fiesta

Get the latest updates on screenings, festivals, critic reviews, and exclusive film events delivered straight to your inbox.

Join thousands of film lovers — no spam, unsubscribe anytime.