আমার বিশ্বাস, বিষণ্ন মন ভালো করার সবচেয়ে বড় ঔষধ হলো হুমায়ূন আহমেদ স্যারের নাটক। এটি কোনো সাধারণ ওষুধ নয়, যেন মন ভালো করার এক পরম জাদুকরী মহৌষধ!
কথাটি নিছক কোনো উক্তি নয়; এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমার জীবনের এক অন্ধকার অতীত। চার-পাঁচ বছর আগের কথা—জীবনের সব আনন্দ যেন ধুয়েমুছে গিয়েছিল, বেঁচে থাকাটাকে তীব্রভাবে অর্থহীন মনে হতো। মনে হতো, এই জীবনটা শেষ হয়ে গেলেই বুঝি মুক্তি! বহুবার নিজের জীবন প্রদীপ নেভানোর চেষ্টা করেছি। একবার বিষ কিনে এনেও ভয়ে প্রথমবার খেতে পারিনি। কিন্তু তার বছর দুয়েক পর, চরম দুঃসাহস জমিয়ে সেই বিষ পান করেই ফেললাম।
কিন্তু পরম আশ্চর্য, আমার কিছুই হলো না! বিষটি কি নকল ছিল, নাকি মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে বেঁচে গেলাম—তা আজও আমার কাছে এক রহস্য।
বিষে কাজ না হওয়ায় সহজে মরে যাওয়ার অন্য উপায় খুঁজতে লাগলাম।
কারণ কয়েক দোকান ঘুরলাম কেউ বিষ বিক্রি করতে চাচ্ছিলো না
মাথায় এলো বজ্রপাতের কথা। সিদ্ধান্ত নিলাম, বর্ষার দিনে যখন আকাশ চিরে বজ্রপাত হবে, তখন গ্রামের সুবিশাল ফাঁকা ধানক্ষেতের মাঝে গিয়ে দাঁড়াব। শুনেছিলাম মেঘের বিদ্যুৎ গায়ে পড়লে নাকি নিমেষেই মানুষ মারা যায়!
প্রথম দিন যখন কানফাটা বিকট শব্দে বিজলী চমকে উঠল, আতঙ্কে বুকটা হিম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মরার তীব্র আকুলতার কাছে সেই ভয় হার মানল। পরবর্তী দিনগুলোতে ভয় এড়াতে কানে আঙুল চেপে ধরে প্রান্তর জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কত দিন যে এভাবে খোলা মাঠে বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর তীব্র আকুলতা নিয়ে পার করেছি!
কিন্তু আমার কপাল খারাপ, বর্ষা বিদায় নিল, অথচ আমার মৃত্যু এলো না।
ঠিক তখনই আমার জীবনে এলো সেই অবিশ্বাস্য মোড়। একদিন মোবাইলে ফেসবুক স্ক্রোল করতে করতে চোখের সামনে ভেসে এলো হুমায়ূন আহমেদ স্যারের 'উড়ে যায় বকপক্ষী' নাটকের একটি দৃশ্য। দৃশ্যটি দেখা মাত্রই বুকের ভেতরের ভারি মেঘটা যেন কেটে গেল। ব্যাকুল হয়ে পুরো নাটকটি একবারে দেখে শেষ করলাম। নাটকটি শেষ হওয়ার পর হৃদয়ে যে কী অপূর্ব শান্তি আর আনন্দের ঢেউ খেলে গেল, তা বলে বোঝানো অসম্ভব!
সেই একটি মুহূর্তই আমার ভাবনার জগত আমূল বদলে দিল। এরপর থেকে আমি একে একে হুমায়ূন স্যারের নাটক দেখা শুরু করলাম।
আশ্চর্যের বিষয় হলো
—যে মুহূর্তে তাঁর গল্পের জগতে নিজেকে সঁপে দিলাম, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই বুকের ভেতরের সব হাহাকার আর মরে যাওয়ার চিন্তাগুলো মাথা থেকে মুছে গেল
আজও যে আমি এই সুন্দর পৃথিবীতে নিশ্বাস নিচ্ছি, বেঁচে থাকার এই দ্বিতীয় জীবনের পুরো কৃতিত্ব হুমায়ূন স্যারের নাটকের।
তাঁর নাটকের একেকটি সংলাপ, চরিত্রের প্রতিটি কথা আমার হৃদয়ের রাজসিংহাসনে চিরতরে আসন পেতে বসেছে।
হুমায়ূন স্যারের এই অপূর্ব সৃষ্টিকে সম্মান জানানোর জন্য একটি শব্দই আমার কাছে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হয়—'সুপারক্যালিফ্রেজিলিস্টিকএক্সপিয়ালিডোসিয়াস' (Supercalifragilisticexpialidocious)
ইংরেজি ভাষার এই শব্দটাও যেন তাঁর নাটকের সৌন্দর্য বোঝাতে গিয়ে ছোট হয়ে যায়।