আহা

’’যেতে নাহি দিবো হায়”

আহা (2007)
এনামুল করিম নির্ঝর
বাংলা
বাংলাদেশ
120
Feb 22, 2026
ড্রামা
9.4 Author Ratingout of 10
বাংলা চলচ্চিত্রের কথা বলা শুরু করার আগে প্রথমত গাস্ত রোর্বেজ এর কিছু কথা দিয়েই শুরু করা যায়। উনার ‘’সিনেমার কথা’’ বই এর মানব চরিত্র বিশ্লেষন এর মধ্য দিয়েই শুরু করা যায়। মানুষ আসলে কি? মানুষ কে বুঝতে হলে কোন বিষয় স্বাভাবিক এবং মৌলিক চরিত্র বিশ্লেষন এর আওতায় আসতে পারে? গাস্ত রোবের্জ তাঁর বই তে উল্লেখ করেছেন,’’মানুষ বলতে আমরা যা বুঝি তার অনেকটাই তাঁর কল্পনা ও স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা।‘’

বাংলা চলচ্চিত্রের কথা বলা শুরু করার আগে প্রথমত গাস্ত রোর্বেজ এর কিছু কথা দিয়েই শুরু করা যায়। উনার ‘’সিনেমার কথা’’ বই এর মানব চরিত্র বিশ্লেষন এর মধ্য দিয়েই শুরু করা যায়। মানুষ আসলে কি? মানুষ কে বুঝতে হলে কোন বিষয় স্বাভাবিক এবং মৌলিক চরিত্র বিশ্লেষন এর আওতায় আসতে পারে? গাস্ত রোবের্জ তাঁর বই তে উল্লেখ করেছেন,’’মানুষ বলতে আমরা যা বুঝি তার অনেকটাই তাঁর কল্পনা ও স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা।‘’


 মানুষ তাঁর জীবন ও অতিবাহিত ই করে থাকে স্বপ্ন আর বাস্তবতার একটা অদেখা দুরত্বে। যা প্রায়শই পৃথক করা যায় না। মানুষ যা আকাঙ্ক্ষা করে তা সে কোনো না কোনোভাবে কিংবা কোনো না কোনো বাহকের মাধ্যমের সেটা পুরন করার আশা রাখে। তাই এই উদ্দেশ্যেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জীবন নামক যাত্রা কিংবা চলচ্চিত্র কিংবা গল্প কিংবা কোনো এক বন্ধুর পথ। এখন এই মানুষই স্বেচ্ছাসেবক নির্মাতা, কিংবা নির্মাতার কোনো মোক্ষম চরিত্র কিংবা নির্মাতার পথপ্রদর্শক। এই বিষয়টি নিতান্তই একটি চক্রকান্ড মাত্র। কারণ নির্মাতার পথপ্রদর্শকেরোও পথপ্রদর্শক বিদ্যমান। নির্মাতার মোক্ষম চরিত্রও কখনো নির্মাতা তাঁর অন্য কোনো একটি মোক্ষম চরিত্রের। সহজ ভাবে কিংবা খানিকটা রসিকভাবে বলতে গেলে ক্ষমতার কিংবা প্রভাব বিস্তারের কিংবা রাজনৈতিক একটি দুষ্টচক্রই হচ্ছে এই মানবজীবন। 

তবুও আমরা ক্রমশ হৃদপিন্ডের সমস্ত রক্তকণিকা এক করে আবার সেটা ছেড়ে দিয়ে বলে ফেলি,


’’যেতে নাহি দিবো হায়” পরক্ষনে অবশ্য এটাও বলি যে, ‘’তবুও যেতে দিতে হয়।‘’


ব্যক্তি মানুষের এই যে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হয়ে ওঠা সেটা অবশ্য তাঁর সামাজিক সম্পর্কের কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়েই গড়ে উঠেছে বলা যায়।যেমন বিশ্বের পরিবর্তন এত দ্রুত সংঘটিত হচ্ছে যে সবার পক্ষে সব কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ সম্ভব হয়ে ওঠেনা তাই আশেপাশের পারিবারিক কিংবা সমাজিক ক্ষেত্রে তাঁর সত্তাটি ক্রমশ আরো সমাজ নির্ভর ই হয়ে উঠছে। হঠাত করেই সে তাঁর মত করে চলতেও পারছেনা কিংবা  অপরপক্ষের ব্যক্তিগত মনোভাবও বিবেচনায় এনে পরিচালিত করতেও পারছেনা। তাকে ভাবতে হচ্ছে তাঁর সামাজিক পদমর্যাদার কথা, তাকে ভাবতে হচ্ছে তাঁর সন্তান দের ভবিষ্যত নিশ্চিত করার কথা, তাকে ভাবতে হচ্ছে নির্দিষ্ট জাতিভিত্তক সংস্কৃতি বা পরম্পরা বাচিয়ে রাখার কথা ইত্যাদি ইত্যাদি।এই ক্ষেত্রে নিজের মত আলাদা একটা পথ বেছে নেয়া বা নিজের মত একটা পরিবেশ গড়ে তোলা মোটেও হাতে তালি দিয়ে গুপি গাইন বাঘাবাইন এর মত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাবার মত কাল্পনিক ও সুখকর নয়। এর জন্য প্রচুর বিল্পবী হতে হয়। যা মানুষের এই অসমান্তরাল জীবনে কতটুকুই বা মেনে নেয়া সম্ভব?এখন কেউ যদি নতুন একটা জাতি তৈরী করতে চায় তাহলে তাঁর কাছে যদি কোনো উদাহরণ ই না থাকে দেয়ার মত তাহলে মানুষ বুঝবে কিভাবে সে আসলে নতুন যে জাতি টা বানাতে চাচ্ছে সেটা আসলে কেমন? কেমন হবে তাঁর পোশাক, কেমন হবে তাঁর দর্শন, কেমন হবে তাঁর ভাষা?সম্ভবতএই কারণেই তাহলে সমাজে অবস্থান করতে হলে সামাজিক জীব হওয়াটা তুলনামূলক সরল এবং বাস্তব এবং একই সাথে সহজ ।মানুষ অনুকরন করে, অভিজ্ঞগতা অর্জন করে, আরেকজন এর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েই বাঁচে। এটাই সর্বত্র সাধারন।   


এখন যদি শিল্পেরও বর্ণনা দেয়া হয় সেটিও অনেক টা জীবন থেকে অর্জন করা অভিজ্ঞতা বা দক্ষতারই ফলরূপ।কারণ শিল্পকর্ম প্রকৃতি থেকেই অনুপ্রানিত। অনুকরন বললেও ভুল বলে বিবেচনা করা যায়না। তাহলে কি শিল্প কে একপ্রকার প্রকৃতির প্রতিবম্ব বা আলোকচিত্র বলা যায় না?এগুলো বিষদ বিষয়। তবে শিল্পকর্মে যা প্রদর্শন করা হয় সেখানে চিত্রশিল্পীর মনের অভ্যন্তরীন ‘সত্য’টাই শিল্পের ধর্মমতে প্রকাশিত হয়।

আবার সিনেমা ও জীবন একে অন্য কে ছেড়ে বৃত্তের পরিধির মত ঘুরে আবার এক বিন্দুতে এসে মিলিত হবে কিংবা রাজনীতি, সমাজ, চিত্রকর্ম,নৈতিকতা বোধ, সম্পর্ক সব সমানে সমানে একি সমান্তরালে পাশাপাশি অবস্থান করে এগিয়ে যেতে থাকবে। যদিও সব সময় সব সিনেমায় নিশ্চয়ই আমরা আমদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠতে দেখিনা। তবে নির্দিষ্ট অনুভুতি অবশ্যই দেখতে পাই যার সাথে আমাদের সংযোগ বিদ্যমান। তবে এখানে বিষয় টি হচ্ছে বিভিন্ন চলচ্চিত্রের সময়ে বিভিন্ন রকম পরিবর্তন সংযোগ-বিয়োগ ঘটেছে। এক সময় আমরা যেমন সিনেমায় কিছু দেখা মানে অতি রঞ্জিত কিছু ভাবে কিংবা জাকজমক সেট এর দেখা পেতাম সেটা কিন্তু ক্রমশ পরিবর্তন হয়েছে। দিন দিন যত বাস্তব আর আপন ভাবে সিনেমা দেখানো যায় সেটা করার চেষ্টা কিন্তু করা হচ্ছে। এবং আস্তে আস্তে এমন একটা পর্যায়েও চলে গেছে যখন মানুষ এই গতা শিলপকর্ম কে নিয়ে পড়াশোনা করতে পারে। বিচার করতে পারে, গবেষণা করতে পারে।    


তবে চিত্র অনুধাবন কিংবা দেখার সময় হলেও কি আমাদের উপলব্ধি গঠনমূলক? আমরা মূলত প্রথমেই এটা কি খারাপ না ভাল? আক্রমনাত্নক নাকি দুঃখভাবাপন্ন সেটিই উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। তবে এই অনুভুতি ভাব-ভঙ্গি,সাজসজ্জা,রেখা , গঠন,ঘনত্ব এবং পরিবেশ দিয়ে বোঝানোর একটি মাধ্যম। সুতরাং সহজ ভাবে বুঝতে গেলে, চিত্রে আসলে কি দুঃখ নাকি সুখ , ভালো নাকি খারাপ বোঝার চেয়েও আরেকটু বেশী-অন্তর্নিহিত একটা ধারণা যেমন-ইতিহাস, কিংবা মনোস্তাত্বিক বিষয়াদি,রাজনৈতিক বিষয়ও  বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।  


আমাদের জীবনে চলচ্চিত্র যে একটি বিশাল জায়গা জুড়ে অবস্থান করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিষয় টা একভাবে এরকম, কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় সে কাঁদছে কেন? সে বলবে, কারন সে দু;খী। আবার একই সাথে সে দুখী বলেই সে কাঁদছে।[সিনেমার কথা]

এটা বলার কারন হচ্ছে , চলচ্চিত্র আমাদের জীবন দিয়ে ঘেরা আবার আমরা অনেক কিছু চলচ্চিত্র থেকে রোজ রোজ নিচ্ছি। এবং আমাদের এই বিংশ শতাব্দি তে মানুষ মূলত চলচ্চিত্র, বই, চারুকলার দ্বারাই একটা আকার পেয়েছে। এর আগেও এমন ছিলো। মানুষ তার অভিজ্ঞতা ও চিন্তা দ্বারাই আবদ্ধ ছিলো সর্বকাল ধরেই। স্বয়ং গৌতম বৌদ্ধও এই বিষয়ে একটি দর্শন দিয়ে গেছেন যার সাথে হয়তো প্রায় সবাই পরিচিত-‘’We are shaped by our thinking, what we think we become”আমি মূলত এই দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। আমার প্রায় সমস্ত কথাতেই ঘুরে ফিরে এই এক কথা চলে আসে। কারণ হয়তো  অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী তো আছেই আবার ক্ষুদ্র জ্ঞ্যান সম্পন্ন অল্পবিদ্যা অথবা সহজবিদ্যা সকল স্থানে প্রয়োগ করে মাঝে মধ্যে নিজেকেও একটু দর্শন প্রেমী মানুষ হিসাবে চিহ্নিত  করার লোভ ও হতে পারে এটা। 


আমাদের আলোচ্য চলচ্চিত্র।যার নাম ‘‘আহা’’। সেটিতে এখনো ঢুকতে পারিনি। আমাদের চলচ্চিত্র তে ঢোকার আগে একটা বিষয় নিয়ে ছোটোখাটো পরিচয় পর্ব সেরে ফেলা যায়। সেটা হচ্ছে স্থাপত্য। স্থাপত্য নিয়ে কেনো আলোচনা করবো সেটা নিশ্চয়ই তেমন অজানা নয়। কারণ ছবির পোস্টারেই দেখা যায় একটা বিশাল রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি। তো বোঝাই যাচ্ছে এই সিনেমা তে বাড়ি সম্পর্কিত কোনো ব্যপার রয়েছে সেটা ছবির প্রচ্ছদেই দেখা যাচ্ছে। এখন প্রাচীন স্থাপত্য কিংবা প্রাচীন বাড়ি গুলো দেখে চেনার উপায় কি সেগুলো কোন সময়ের বা কত পুরানো ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, পশ্চিমে যখন গ্রীক ও গথিক দুই ধরণের স্থাপত্য শিল্পের বিকাশ হয় তখন সেগুলোত নকশা বা কাঠামো গুলো ছিলো সেই সময় কার সমাজকেন্দ্রিক ধর্মীয় বিশ্বাস ও সেই যুগের দর্শন ।এছাড়াও ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক অনেক দর্শন এর উপরেও কাজ দেখা যায়। ভারতীয় স্থাপত্য ও তাই। অবশ্যই জায়গা ভিত্তিক ভিন্নতা আছে,,গল্পে ভিন্নতা আছে।তবে সব ধরণের স্থাপত্যের সাথেই চলচ্চিত্রের যে সম্পর্ক সেটি হচ্ছে , একটি বাড়ি কে বিভিন্ন দিক থেকে দেখে দেখলে যেমন নতুন নতুন রূপ প্রতিভাত হয় চলচ্চিত্রের ও অনেকাংশে সেদিকে মিল রয়েছে। তো


‘’আহা’’ চলচ্চিত্রে যে রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ি টি দেখা যায় সেটি মূলত ব্রিটিশ ও জমিদার বাড়ির প্রভাবের সংমিশ্রনে গড়ে ওঠা একটা বাড়ি। বোঝাই যাচ্ছে বাড়ি টি বহু পুরানো এবং যাকে কেন্দ্র করে গল্পটি একটা ধারাবাহিকতা পেয়েছে তিনি হচ্ছেন উত্তরাধিকার সুত্রে এই বাড়ির মালিক। এই বিশাল রাজ প্রাসাদের রক্ষনাবেক্ষন তাকে একাই করতে হচ্ছে। এবং এই রক্ষনাবেক্ষন এর কাজটা তিনি একাই করে যাচ্ছেন দুজন কাজের লোক আর উনার স্ত্রী এর বোন এর মানসিক সহয়তায়।  এবং সেক্ষেত্রে তার নিজের এবং নিজের ছেলেমেয়ে এবং ছেলেমেয়ের বয়সী মানুষ এর মনোভাব এর সাথে প্রজন্ম ব্যবধানগত একটা মনোমালিন্য ও লক্ষ করা যায়। ছেলেমেয়ে বলছে এই বাড়ি টা একটা শিল্প সম্পদ আবার উত্তরাধিকার সু্ত্রে বাড়ির মালিক মল্লিক সাহেব কে  এটা চিন্তা করতে হচ্ছে যে এই বাড়ি থেকে তিনি সামনে এগোতে পারবেন না। নিশ্চয়তা ও দিতে পারবেন না তার কন্যা ও কন্যার ছেলে কে।একি সাথে তিনি নিজেও জানেন। এই বাড়িটি একটি স্থাপত্য শিল্প সম্পদ। কিন্তু তবুও বাস্তবতার কাছে তাকে মাথা নোয়াতে হচ্ছে। চরিত্র বিশ্লেষন নিয়ে পরে আরো বিষদ আলোচনা আছে তবে এর আগে এটা বোঝা জরুরী যে পরিচালক কিভাবে এই রকম একটা গল্প বা গল্পে চরিত্র দের বহুমাত্রিক মনোভাব কে তুলে ধরলেন। 


পরিচালক এনামুল করিম নির্ঝর নিজেই একজন স্থপতি। তিনি রাজশাহী তে জন্মগ্রহন করেন। বুয়েট থেকে স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।  তিনি তার চলচ্চিত্রে সমাজ, রাস্ট্র, আধুনিকতা নিয়ে যে জটিলতা তৈরী হচ্ছে এবং তরুণ সমাজে , শিক্ষার উপরে কি ধরণের প্রভাব পড়ছে এবং সেই পরিনামে যে সামাজিক সমস্যা হচ্ছে সেটিই উপস্থাপন করতে চান। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যে জটিলতা, সম্পর্কের যে জটিলতা সেটি নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। তিনি চলচ্চিত্রকার হবার আগেও স্থপতি,  গ্রাফিক ডিজাইনার, আলোকচিত্র গ্রাহক এবং ইনটেরিয়র ডিজাইনার হিসাবে কাজ করে গেছেন। ৭৩ সালে উনার একক প্রদর্শনী হওয়ার পর তিনি আগ্রহী হন চলচ্চিত্র নির্মানে। তিনি অনেক প্রামান্যচিত্র চিত্র নির্মান করেছেন, যেমন ,- the Shadow Gap (2003) , Once Upon a Time!(2004), The Architect (2005) । 


তারপর তিনি একটি পূর্নদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মান করে ‘’আহা!’’ অনুভুতি থেকেই সিনেমাটির নামকরণ ’’আহা’’ করেন।


 যাই হোক নামকরণের স্বার্থকতা মোটেও এটি নয়। কষ্টের  কোনো অনুভুতি হতে পারে । কারণ গল্পের শেষাত্নক একটু ট্র্যাজিক। তো সেই ক্ষত্রে আহা! শব্দটা আসতে পারে  আবার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অর্থে ও ব্যবহৃত হতে পারে। কখনো সুখের ও হতে পারে। কারো বাড়ি ছেড়ে চিরতরে চলে যেতে হচ্ছে। ফেরার পর এই বাড়ী আর এই রকম থাকবে না। অপরিচিত আধুনিক একটা দালান হয়ে যাবে। মহীনের ঘোড়াগুলির একটা গানের লাইন মনে পড়ছে, ‘’ফিরবো বললে ফেরা যায় নাকি’’


তো পরিচালক সম্পর্কে জানার পর নিশ্চয়ই এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে তিনি কেনো স্থাপত্য নিয়ে এই প্রথম সিনেমা টি নির্মান করলেন। বোধ করি সকল আর্কিটেক্ট দের ই এই ধরণের বাড়ির প্রতি বিশেষ এক ধরণের অনুভুতি কাজ করে।কারণ  উনাদের কাছে এই বাড়ি গুলি অত্যন্ত কাছের। কেননা এই ছবিতেই দেখানো হয়েছে যে স্থাপত্যের শিক্ষার্থী দের এমন বাড়ি পরিদর্শন এর জন্য প্রায়শই পাঠানো হয়। তাঁরা এই বাড়ির মূল্য অন্য সকল সাধারণ মানুষের চাইতে অনেক বেশিই বুঝে থাকেন, এনামুল করিম নির্ঝর শুধু মাত্র বাড়িটি সম্পর্কেই আলোচনা করেছেন তা নয় তিনি বাড়ির ভেতরে বাড়ির উত্তরাধিকার সূত্রে  মালিকের মনস্তাত্বিক বিষয়েও মনোনিবেশ করেছেন। এই মল্লিক সাহেব এর সংলাপ, অভিব্যক্তি দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন কিভাবে এবং কেন ঢাকার পুরনো বাড়ি গুলো তে নতুন নতুন আধুনিক বিল্ডিং গড়ে উঠছে। এবং কেনোই বা মল্লিক সাহেব এর মত একজন সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং এলাকার বিশিষ্ট সম্মানী লোক যার এই বাড়ি টাই বিরাট একটা সম্পদ। এমন মানুষ কে তাঁর নিজের বাড়ি ভেঙে ফেলার মত সিধান্ত নিতে হচ্ছে। এবং কারা এই প্রস্তাব গুলো মল্লিক সাহেব দের কাছে নিয়ে আসেন। এই যে পুরো এই প্রসেসটা এটা কিন্তু কাকতালীয় কোনো ঘটনাই নয় বা একজন দুইজন এর সাথে মাঝেমাঝে ঘটে তা কিন্তু নয় । মানুষ কিন্তু প্রায়ই এই অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। তবে সব সময় হয়তো আমাদের কাছে এই খবর গুলো আসেও না। অমুক রাজপ্রাসাদ ভাঙা হচ্ছে, তমুক বাড়ি মেরামত এর জন্য সরকার অর্থ প্রদান করছে । এইসব খবর স্থপতি আর স্থানীয় এলাকায় বসবাস করা মানুষ এরই বেশি জানার কথা। তো এই সিনেমার কিছু অংশ পরিচালক এর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও থেকেও অনুপ্রানিত হতে পারে।  


এছাড়াও ৭০ এর দশক এর ‘’জীবন থেকে নেয়া’’ সিনেমায় যেমন একটি পরিবার দিয়ে গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা কে তুলে ধরেছিলেন জহির রায়হান তেমনি ‘’আহা’’ চলচ্চিত্র তেও একটি পুরনো বাড়ি,মালি বা দারোয়ান সোলেমান এবং এলাকার মাস্তান দের দিয়েও বর্তমান সময়ের রাষ্ট্র ব্যবস্থা কে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ এর নৈতিকতাঁর বিচিত্রমুখিতাও তুলে ধরা হয়েছে এখানে।তাছাড়া স্থাপত্যশিল্প ধ্বংস টাই এখানে শেষ কথা নয়। স্থাপত্য শিল্পের ধ্বংসের সাথে মানুষ এর সম্পর্ক আর আত্নার বন্ধন ভাঙন এর বিষয়টিও সমলয় করা হয়েছে। এই সমস্ত কিছু ভাবতে গিয়ে একটা কবিতার সাথে একটা সংযোগ খুজে পাওয়া যায়, 

 

‘’মনে করো, গাড়ি রেখে ইস্টিশান দৌড়চ্ছে, নিবন্ত ডুমের পাশে তারার আলো
মনে করো জুতো হাঁটছে, পা রয়েছে স্থিরআকাশ-পাতাল এতোল-বেতোল
মনে করো, শিশুর কাঁধে মড়ার পাল্কি ছুটছে নিমতলা পরপারে
বুড়োদের লম্বালম্বি বাসরঘরী নাচ---
সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে বড়ো আনন্দের সময় নয়
তখনই
পা থেকে মাথা পর্যন্ত টলমল করে, দেয়ালে দেয়াল, কার্নিশে কার্নিশ,
                          ফুটপাত বদল হয় মধ্যরাতে
বাড়ি ফেরার সময়, বাড়ির ভিতর বাড়ি. পায়ের ভিতরে পা, বুকের ভিতর বুক
আর কিছু নয় ||


-শক্তি চট্টপাধ্যায়"


পরিচালক তাঁর চলচ্চিত্রে অনেক সহজ ব্যপার বা সরাসরি দেখানো যায় এমন দৃশ্য দেখানোর সময় সৃজনশীলতার আশ্রয় নিয়েছেন । যেমন , রুবার স্বপ্নের ছোটো ছোটো  কিছু ঝলক দেখিয়ে যেখানে রুবার খেলার পুতুল, পায়ের নুপুরকে দেখানো হচ্ছে সেটা দিয়ে রুবার সাথে এই বাড়ির আত্নিক সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। পুতুল, হাড়িপাতিল, ঘুঙুর এইসব কিছু দিয়ে রুবার শৈশব সম্পর্কে একতা ধারণা পাওয়া যায়। এবং রুবার এঘর ওঘর ঘোরাঘুরি কিন্তু কেবল ই ঘুরে বেড়ানো নয়। রুবা চারপাশে কি দেখছে, কাকে দেখছে, এবং কিভাবে বাড়িটাকে স্পর্শ করে তাঁর অনুভুতি নিচ্ছে সেটাও কিন্তু  একধরণের ভাষা বলে বিবেচনায় আনা হয়েছে । রঙ বেরং এর ঘুড়ি দিয়ে মানুষের মন কে বা আত্না কে বুঝিয়েছেন আবার মানুষ এর অস্তিত্ব কেউ চিত্রিত করেছেন। যখন কিসলু সাহেব মারা যান তখন সাত রঙ এর ঘুড়ি আকাশ থেকে ঝরে পড়তে থাকে। নাটাই থেকে সুতা ছিড়ে গেলে ঘুরি যেভাবে পরে আর মানুষের মৃত্যুর পর দেহের সাথে আত্নিক বন্ধন ছিন্ন হওয়ার যে বিষয় সেটি বোঝানোর তাগিদেই এই চিত্রটি। এই বাড়িটা দেখানোর সময় ফ্রেমে বার বার প্রকৃতির সাথে বাড়িটার সম্পর্ক দেখা যায়। গাছপালা, পাখির ডাক,পাখির উড়ে এসে বসা ইত্যাদি একটা বাড়ি আর প্রকৃতির প্রাচীন কোনো বন্ধন কে লক্ষ্য করছে৷ অনেক বছর এই বাড়ি যেহেতু ভাঙা হচ্ছেনা তাই প্রকৃতি একটা আশ্রয় নিয়েছে বাড়িটাকে ঘিরে৷ এটা যে সিনেমায় দেখানোর জন্য দেখানো হয়েছে তা না। এটা একটা সাধারণ পশুপাখির সহজাত প্রবৃত্তিতে পরে। কারণ একটা বাড়িতে বহুদিন ধরে কেউ কোনো আঘাত করছে না। কোনো বিষাক্তআর দমবন্ধ ব্যপার টা নেই তাহলে অবশ্যই এখানে পাখিরা নিরাপদ বোধ করবে৷ তাই এখানে নিজেদের নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য একটা জায়গা করে নিয়েছিলো তারা।  তবে শেষমেশ সেটা আর রক্ষা হলো কই।      

এরপর আসি ২০০৭ সালের দিকে। আওয়ামিলীগ ও তাঁর সহযোগিরা যখন নির্বাচন প্রত্যাহার করার ঘোষনা দেয় তখন দেশে আরো বিক্ষোভ ও সহিংসতা যুক্ত হয়েছিলো। ফলে দেশের  উপর যে প্রভাব ফেলে সেই বিষয়টিও চলচ্চিত্রকার এড়িয়ে যাননি। সেই সময়ের হরতাল এবং বিক্ষোভ মিছিল পরিবেশের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যায়। সেই সময়ের বাস্তবতার একটা ধারা বজায় রেখেছে। যতটুকু সম্ভব বাস্তবতাই চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে, সেট ডিজাইনিং,চরিত্র সমূহ সবকিছুই বাস্তবতা ভিত্তিক একেকটা সত্তা কে প্রদর্শন করে। শেয়ার বাজার এর গল্প এবং কিসলু সাহেব এর বাথরুম এ যাওয়ার তাড়া টাও একটা ভালো রসবোধ এর জন্ম দিয়েছে। যদি এভাবে ভাবি যে কিসলু হাসান একজন শিশু৷ যে এত ঝামেলায় পড়তে চায়না৷ তাই সে তার বন্ধুর শেয়ার বাজারে ইনভেস্ট করার কাহিনী জানতে আগ্রহীই না। তো একটা  শিশু মনের মানুষেরা কিংবা ঝুট ঝামেলা বিহীন জীবন যাপনের মানুষেরা এইসব শেয়ার বাজারের মত উটকো ঝামেলা থেকে মুক্তি চাচ্ছে কিন্তু তবুও তাকে বাধ্য হয়ে এই সকল  জঞ্জাল এর মধ্যে ভদ্রতার খাতিরে পরে থাকতে হচ্ছে তাহলে এই ব্যপার টা হাসির উদ্রেক ঘটানোর জন্য খারাপ না। 


সিনেমার আর্ট এক্সপ্রেশন ঝালাই করে একটু সিনেমা টা কে আরেকটু দ্রবনীয় করা হোক। মৃত্যুর দৃশ্যে সম্ভবত রেনেসা আর্ট এর হাল্কা প্রভাব লক্ষ করা যায়। কারণ পরিচালক এখানে মৃত্যু সরাসরি দেখান নি। কারণ তাঁর মূল উদ্দেশ্য রোমাঞ্ছকর খুন দেখান ছিলো না। তিনি মূলত বেশী ফোকাস করতে চেয়েছেন মল্লিক সাহেবের নৈতিকতা অবক্ষয় এর উপর। কিভাবে তিনি সোলেমান কে দিয়ে এমন একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধে সামিল করলেন।  তাছাড়া একটা খুন দেখানো ভালো মানের পরিশ্রম আর খরচের প্রত্যাশা রাখে। রোমান্টিসিজম এর প্রভাব আরো বেশী স্পষ্টভাবে লক্ষনীয়। কারণ এই সিনেমাটি কাজ ই করেছে স্বতন্ত্র মন আর চরিত্রের ব্যক্তিগত ভাবনা নিয়ে। এই বিশেষ ফ্রেম টি আমি জানিনা লক্ষ করার মত কিনা। চায়ের দোকানে যখন  ছেলেপেলেরা বসে আড্ডা দিচ্ছে তখন দেখা যাচ্ছে একজন মহিলা যিনি একটু উপরে বসে আছেন।  এবং বাকিরা একটু নিচে বেঞ্চে।  আর মহিলাটির কাজ হচ্ছে বসে বসে সবাই কে চা খাওয়ানো। এটা দিয়ে কি কোনো নারী ক্ষমতার রাষ্ট্র বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে কিনা সে ব্যপারে আমি সন্ধিহান। যেমন যে শুধু অর্ডার দেয় সে শুধু বসে বসে দেখছে আর বাকিরা নিজের মন গড়া আড্ডা দিচ্ছে আর বড় বড় পরামর্শ নিজেরাই করছে।  চা খাওয়া টা একটা ক্ষুদ্র পরিসরের বিনোদন মাত্র। যার জন্য চা বানানোর লোক দরকার। তো একটা একটা দৃষ্টিভঙ্গি৷ হলেও হতে পারে আর প্রকৃতি আর প্রাক্তন এর অনেক প্রভাব ই ফুটে উঠতে দেখা যায় বিভিন্ন চিত্রায়নে। আরেকদিক থেকে রিয়েলিজম ও ধরা যায় কারণ ব্যক্তি চরিত্রের যে সরাসরি আলোকচিত্রের সাথে একটা সংযোগ বা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সরাসরি সত্য একটা সত্তা প্রকাশ এর প্রবণতা সেটিও অ-লক্ষনীয় নয়। 


বিনোদনের মাত্রা বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কারো কাছে বিনোদোন মানে একটার পর একটা কঠিন সাসপেন্স হতে পারে। কারো কাছে বিনোদন মানে আইটেম সং হতে পারে। কার কাছে একটা উপন্যাসে দির্ঘদিন বসবাস করাও হতে পারে। এই সিনেমায় বিনোদন এর মাধ্যম ছিলো গল্পটা। গল্প কিভাবে এগোচ্ছে। গল্পের চরিত্রেরা কখন কি পরিস্থিতি তে কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটা ছিলো মুখ্য বিষয়।যদিও বিল্পবী কোনো পদক্ষেপ কাউকে নিতে দেখা যায়নি । কিন্তু একটা গল্পের শেষ ছিলো। শুরু টা যদি ডেভলাপার এর ড্রিম প্রোপারটিস বানানোর আশায় বাড়িতে ঢুকে আমোদ করা ধরা হয় তাহলে গল্পের শুরু ও ছিলো।যদি বিচ্ছিন্ন গল্প গুলো ধরা হয় তাহলে কয়েকটা গল্প পূর্ন ছিলো কয়েকটা ছিলো অপুর্ণ। সুতরাং স্টোরি টেলিং বা গল্প বলার দিক থেকে এই চলচ্চিত্রে বিনোদন এর ঘাটতি কম ই দেখা যায়। যদিও বিনোদন আসলে বিনোদন হতে কি কি ক্রাইটেরিয়া লাগে তা আমার জানা নেই।আমি দর্শক হিসেবে মন দিয়ে দেখেছি এবং গল্পটা শেষ পর্যন্ত দেখার ও একটা ইচ্ছা সত্যিকার অর্থেই মনে ছিলো। তাই বিনোদন হিসাবেও এই চলচ্চিত্র কে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আর একটা গল্প দেখে একটা সম্পর্ক বোধ করা যায় এরকম গল্প ভালো লাগাটাই স্বাভাবিক। কাহিনি খুবই প্রেডিক্টেবল ছিলো তা ও কিন্তু পুরোপুরি সঠিক নয়। কিসলু হাসান যে খুন হতে পারে সেটা তো কল্পনাতেই আসার কথা না কারো।কিন্তু যদিও গল্পে  নতুন কিছু আবিষ্কার বা যুগান্তকারি কোনো উদ্যোগ এর কথা বলা হয়নি যে মানুষ এখান থেকে কিছু করতে চাইবে কিংবা কোন মনোজাগরণ এর জন্ম দিবে। ৭১ এর যুদ্ধ নিয়ে আমরা যে সব সিনেমা দেখি সেখানে আমাদের মনে একধরনের মায়া বোধ বিল্পবী বোধ অথবা দেশের প্রতি ভালোবাসা বোধ এর জন্ম দেয়। হুমায়ুন আহমেদ এর শ্যামল ছায়া দেখার পর  দেশের মানুষ কেঁদেছে ও। আমার বন্ধু রাশেদ দেখার পর ছোট ছোটো বাচ্চা রা স্বপ্ন দেখতে উদবুদ্ধ হয়েছে। এমন কি আমদের সময় ই  আমরা যখন এই সিনেমা দেখি তখন ভাবতাম কিভাবে এমন কিছু করা যায় যাতে দেশের জন্য কাজ করা যায়। রাশেদ এর মত নির্ভিক হতে চাইতাম। স্কুল এর সুরঙ্গ পথ পারি দিয়ে চলে যেতে চাইতাম, কোথাও। তবে এই সিনেমায় এমন কোনো উপাদান নেই যাতে এমন কিছু হবে। তবে বাড়ির মালিক মল্লিক সাহেব এর পরিস্থিতি এক পাক্ষিক ভাবে না দেখিয়ে বহু মাত্রায় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যা এই চরিত্র কে আরো জানতে আগ্রহী করেছে।  উনার দায়িত্ব ও ছিলো বহুমাত্রিক অবশ্য। তবে  এই সিনেমাতে একটি জিনিষ  অবশ্যই শেখার আছে সেটি হচ্ছে মেয়ে যদি কথা না শোনে এবং কথা শুনে প্রেম চালিয়ে যায় তাহলে সোলেমান কে ভাড়া করে মেয়ের প্রেমিক এর দফারফা করা যেতে পারে। এটি একটি চুরান্ত ম্যাসেজ। 


তবে বলিউড কিংবা সুপার হিরো টাইপ সিনেমা দেখতে বসলে যেমন ‘’বিনোদন, বিনোদন এবং বিনোদন’’ এর প্রত্যাশা রাখা হয় এই সিনেমা এই প্রত্যাশায় দেখলে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে গন-যোগাযোগ এর দৃষ্টি তে যদি চিন্তা করতে যাই তবে এখানে  বিরাটা একটা পয়েন্ট পাওয়া যাবে। সেটা হচ্ছে স্যোশাল রিপ্রেজেন্টেশন বা সামাজিক প্রতিনিধিত্ব। আমাদের চারপাশের যা কিছু ঘটছে বা সাধারণ মানুষ যা কিছু করছে তাঁর অনেক কিছুরই মূল জিনিষ টা ধরা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। যেমন মল্লিক সাহেব এলাকার গুরুজন এবং তাঁর অধিনস্থ কেউ তাকে সম্মান প্রদর্শন না করলে তিনি যথাযথই বিরক্ত হন। কারণ সমাজ তাকে সম্মান এর  সিংহাসনেই চড়িয়ে রেখেছেন। তারপর রুবার স্বামী বাংলাদেশের স্বামী সমাজ কে রিপ্রেজেন্ট পুরোপুরি না করলেও সমাজ এবং পারিবারিক প্রভাবেই সে নিজেকে কর্তা ধারার মানুষ ই মনে করে। এবং সেখান থেকেই তাঁর এই অত্যাচার করার প্রবণতা টি এসেছে। আর মল্লিক সাহেব এর তাঁর নাতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা প্রকাশ করার মাধ্যম টা যে একদম ই সামাজিক সেটা লক্ষ করা যায়। মুসলমানির অনুষ্ঠান বিয়ে বাড়ির মত না করলে সেই এলাকায় মুখ দেখানো যায় না বলেই তিনি মনে করেন। এটা অবশ্য বহুদিন ধরে চলে আসা একটা প্রথাই বলা যায়। এলাকার পদমর্যাদা ধরে রাখার মত। কোথায় যেন পড়েছিলাম মানুষ দিন দিন ব্যক্তিগত সম্পর্ক কে অধিক মাত্রায় সামাজিক করে গড়ে তুলেছে। 


এখন আসি চরিত্র বিশ্লেষন এর অংশে। সর্বপ্রথম মল্লিক সাহেব কে দিয়েই শুরু করা যাক । মল্লিক সাহেব হাজারীবাগ এর একটি রাজপ্রাসাদের উত্তরাধিকার সুত্রে মালিক সেটা আগেই বলেছি। তবে মল্লিক সাহেব ব্যক্তি হিসাবে কেমন সেটার একটা বিশ্লেষন করা যাক। মল্লিক সাহেব এর একটি মাত্র মেয়ে তাঁর স্ত্রী মেয়ের শৈশব এই মৃত্যুবরণ করেন। এবং মল্লিক সাহেব তাঁর একমাত্র মেয়ে রুবা কে আমেরিকার প্রবাসী মারুফ এর কাছে বিয়ে দিয়ে একাই দুইজন লোক নিয়ে বসবাস করেন। একজন হচ্ছে দায়য়ান এবং মালি সোলেমান আরে আরেকজন বাড়ির ভেতরের অংশ কাজ করে। যার নাম হচ্ছে রতন। মল্লিক সাহেব যে খুব বদমেজাজী বা দুষ্ট প্রকৃতির লোক তা নয়। তিনি অধিনস্থ দের তাঁর প্রতি অবহেলা দেখলে বিরক্ত হন। এবং এলাকার গুরুজন হিসাবেও নূন্যতম সম্মান আশা করেন। মল্লিক সাহেব একজন শিক্ষিত ব্যক্তি, গান বাজনা পছন্দ করেন, ধর্ম , বর্ণ, জাত নিয়ে উনার কোনো বিদ্বেষমূলক মনোভাব নেই। সেটা মূলত প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায়। তিনি মন দিয়ে অসাম্প্রদায়িক গান শুনছেন। এবং তিনি চান একটা ঝামেলাহীন জীবন পার করতে কিন্তু সংসারের দায়িত্ব থেকে তিনি পুরোপুরী মুখ সরিয়ে নিতে পারছেন না। কলিং বেল এর শব্দ শুনলে তিনি এখনো অস্থির হয়ে পড়েন। এদিকে ডেভোলাপার এরও রোজ রোজ আসা নিয়ে নিয়ে ঠিক বিরক্ত ও নন। বলা যায় তিনি সন্ধিহান। এই পূর্ব পুরুষের বাড়ি নিয়ে তিনি কিভাবে রিক্ষা করে করে চলবেন একদিকে হিমশিম খাচ্ছেন আরেকদিকে মায়া আর স্মৃতির জালে ও আবদ্ধ। তিনি তাঁর একমাত্র মেয়ে কে বিদেশে বিয়ে দিয়েছেন তবে মেয়ে যখন বাংলাদেশ এ ফিরে আসতে চাইলো তখন তিনি অস্থির হয়ে গেলেন দুশ্চিন্তায়। তাঁর মনে হতে লাগলো তাঁর মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। মেয়ে ফিরে আসার পর ও আবার তিনি বার বার অপেক্ষা ও করছেন তাঁর  মেয়ে রুবার স্বামী কি যোগাযোগ করলো কিনা। যেকোনো ভাবেই হোক তিনি এই সম্পর্ক ভেঙে যাক তা তিনি চান না। অথচ তিনি জানেন তাঁর মেয়ে কে তাঁর মেয়ের স্বামী কিভাবে মারধোর করেছে। এখানে আসলে একটা খটকা রয়েই যায় সেটা হচ্ছে এটা কি ব্যক্তি মল্লিক সাহেব এর চরিত্র বিশ্লেষন করা হচ্ছে নাকি সামাজিক চরিত্র বিশ্লেষন। বলা বাহুল্য তিনি পারিবারিক মল্লিক সাহেব এর চেয়ে সামাজিক মল্লিক সাহেব ই বেশি। কারন সিনেমায় যখন মল্লিক সাহেব কে হাটতে দেখা যায় তখন দেখা যায় ক্যামেরা অনেক লোহা রেলিং এর ভেতর দিয়ে ধরা। এর মানে যেটা প্রতিফলিত হতে পারে সেটা হচ্ছে, মল্লিক সাহেব সমাজের নিয়ম কানুন আর সংস্কৃতি দ্বারা আবব্ধ। এবং মানুষ যখন তাঁর কাছে সাহয্যের জন্য আসেন তিনি না করতে পারেন না। সোলেমান যখন খুন করার পর সমাজ থেকে বিতারিত হয়ে মল্লিক সাহেব এর কাছে আশ্রয় এর জন্য যান যান তখন তিনি সোলেমান কে তাড়িয়ে দিতে চান ঠিকই তবে সোলেমান যখন মল্লিক সাহেব "দ্বারা" শুদ্ধ হতে চায় তখন মল্লিক সাহেব সোলেমান কে আরেকবার সুযোগ দিলেন একান্ত মায়া বোধ করার ক্ষমতা থেকেই। কারণ কেউ তাঁর কাছে সাহায্য চাইছে এসেছে এতে তিনি উপকার করতে পেরে আনন্দিত। যদিও পরবর্তী তে কিসলুর খুন করিয়ে তাঁর যথাসময়ে তাঁর গুরুদক্ষিনা আদায় করে নেন। মল্লিক সাহেব এর কাছে রোজ রোজ ডেভোলাপার আসার কারণে তাঁর মনে যে বাড়ী ভেঙে এপার্ট্মেন্ট করার একটা সংশয় ছিলো সেটা তিনি ভেস্তে দিয়ে দিলেন। তিনি দলিলে সই করে দিলেন এই ভেবে যে এপার্ট্মেন্ট বানালে সেখানে নয়টা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে পরিবার পরিজন কে নিয়ে থাকতে পারবেন শান্তি বাকি জীবন টা। এবং তাঁর এত বিপুল পরিমান অর্থ সম্পদ ও নেই যে এই বিশাল বাড়ী মেইনটেইন করে তিনি এখানে বসবাস করবেন আমৃত্যু। এমন নয় তিনি স্থাপত্য শিল্পের মুল্য দিতে জানেন না। তিনি জানেন দেশে বিদেশে এই পুরানো সভ্যতা কিভাবে সংরক্ষন করা হয়। এবং তিনি এও জানেন এই সংরক্ষন এর জন্য সরকার থেকে যে আর্থিক সাহায্য পায় সেটা বাংলাদেশ এ কেউ ই পায় না। তাই  এত কথা ভেবেই তিনি এই বাড়িটি ডেভোলাপারের হাতেই তুলে দেন মেয়ে এবং মেয়ের সন্তানের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে। তবে এর বাইরেই কি? মল্লিক সাহেব এর পক্ষে রাতারাতি বিল্পবী হয়ে ওঠাও সম্ভব ছিলো না। তিনি কি চাইলেই এই বাড়ি সংরক্ষন করার জন্য বিল্পব গড়ে তুলতে পারতেন ?


গল্পের পরবর্তী চরিতের নাম হচ্ছে রুবা। রুবা মল্লিক সাহেব এর একমাত্র কন্যা। খুব অল্প বয়সে তাঁর মা মারা যায় এবং  তাঁর বিয়ে হয়ে যায় আমেরিকা প্রবাসী একজন সুযোগ্য পাত্রের সঙ্গে । তাঁর একটি মাত্র পুত্র সন্তান যাকে লালন পালন করার দায়িত্ব রুবা নিয়েছে । আমেরিকা প্রবাসী পাত্র সুযোগ্য হলেও প্রচন্ড কর্তিত্ব ফলানো থেকে পিছুপা না হয়ে শুরু করতে থাকেন তাঁর স্ত্রী এর উপর নির্যাতন। স্ত্রী রুবা সহ্য করতে না পেরে অবষেশষে ফিরে আসে বাংলাদেশে তাঁর বাবার কাছে , আপন বাড়িতে। এই রকম ঘটনা কিন্তু আমরা অহরহ দেখতে পাই চারপাশে। বহুল পরিচিত একটা কাহিনী। মেয়ের বিয়ে দেয়া মানেই যে পরিবার মেয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ফেলেন এই ধরণের একটা চিন্তাবভাবনা বা বিশ্বাস সমাজে প্রচলিত। এই জন্য মেয়েদের পড়াশোনা বাইরে কাজ করাটা হয়ে উঠে একটা শখ। আমার আসশেপাসশে প্রায়ই শুনি। একটা মেয়ে অনার্স  শেষ করে মাস্টার্স  করতে চাচ্ছে বা পিএইচডি করতে চাচ্ছে এটা কে সমাজের মানুষ তো দূরে থাক পরিবারের মানুষ ও শখ বলে গন্য করে থাকে। এবনং মেয়েটির সাম্নেই সবাই কে খুব আমতা আমতা করে বলে থাকে। আমাদের মেয়ের উচ্চতর ডিগ্রি করার শখ। ছেলেদের ক্ষেত্রে আবার এই ডিগ্রি পূরন না করতে পারলে দামই নেই সমাজে। ছেলে মানুষ হয়েছে তো অবশ্যই তাকে এই সকল ক্রাইটেরিয়া পুরণ করতে হবে। তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা থাকুক বা না ই থাকুক। রুবার পরিবারের মত অনেক পরিবারেই বিদেশে থাকা কে একটা যোগ্যতা হিসাবে গননা করা হয়। তাঁরা চিন্তাও করেনা চছেলে বিদেশে গিয়ে কি করে, কাদের সাথে মেশে, তাঁর বেড়ে ওঠা টা কেমন। এরকম একটা ধারণা হয়ে যায় যেহেতু বিদেশে থাকে তাহলে তো ছেলের স্বভাব চরিত্র দেবতার মত হওয়ার কথা। যখন মেয়ে বিদেশ থেকে বাবা মায়ের খবর নেয়ার জন্য ফোন করে। তখন গর্ব করে বলার জন্য যে আমার মেয়ে বিদেশে থাকে। আরো অনেক ব্যপার ই আছে।  এখন রুবাতে ফিরে আসি। রুবা যখন টেলিফোন করে জানালো যে তাঁর বাড়িতে বাংলাদেশ এ ফিরে আসতে চায়। তখন মল্লিক সাহেব অস্থির হয়ে গেলেন। রুবা বাড়ি ছাড়ার পর পুলিশের কাছে শেল্টার নিয়ে কোনো কাপড়-চোপড় ছাড়াই দেশে চলে আসে। তখন ও বাংলাদেশের সাধারণ অভিভাবক এর মত মল্লিক সাহেব ও চেষ্টা করতে থাকলেন তাঁর মেয়ে ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক কে জোড়া লাগাতে। এবং  তিনি বার বার রুবার সাথে রুবার স্বামি নিয়ে কথা বলতে থাকে। মল্লিক সাহেব তাঁর মেয়ে কে বুঝতে পারছেন না। বার বার রুবা এই বিষয় টি এড়িয়ে গেলেও বার বার তাঁর বাবা তাকে এই বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য জোড় দিচ্ছেন। 


রুবা বাড়িতে আসার পর দেখলো তাদের বাড়ির আসেপাসশের বাড়ি গুলো সব পালটে গেছে। সবই বড় বড় দালান দিয়ে ভরে গেছে।  কিন্তু তাঁরা এই বাড়ি নিয়ে পড়ে আছে এই বাড়িতে। সেটা নিয়ে অবশ্য রুবার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তাঁর কোমল মন নিয়ে তাঁর শৈশব এর স্মৃতিচারন ই করছে। এই জনিষ টি তাঁর স্বপ্নের মাধ্যমে বার বার প্রকাশ করার চেষ্টা করেছে পরিচালক। তাঁর ছোট বেলা ছিলো খুবই রঙিন আর সুখময়।  বা একভাবে বলা যায় অন্য সব সাধারণ মেয়ের মতই সুস্থ এবং স্বাভাবিক। কোনো প্রকার জটিলতা তাঁর শৈশব  দেখা যায়নি। আর বাড়ি  টা ভাঙা নিয়ে তাঁর একটা আবেগমাখা দৃষ্টিকোণ ছিলো বলেই বাড়িটা বিক্রি হয়ে যাক সেটা সে চায়নি। মানুষ এর খুচরা প্রেমময় আবেদন ও তাঁর কাছে তেমন গ্রহনযোগ্য লাগেনা। যেমন আসিফ যখন বিভিন্ন ছলে বলে তাঁর সাথে প্রেমময় এবং কেবল শরীর কেন্দ্রিক  সম্পর্ক  হলেও করতে চায় বলতে চায় তখন রুবা  মোটেও তাকে পাত্তা দেয় নি। কারন আমেরিকা থেকে স্বামির কাছ থেকে এত নির্যাতন সহ্য করার পর আসিফ মুলত আগুনে এলকোহল ঢেলে দিয়েছে। অপর সিকে কিসলু সাহেবের লাজুক আর সাধারন অভিব্যক্তি তাকে আরো কোমল করেছে। রুবা কিসলু সাহেব কে একজন ভদ্রলোক হিসাবেই তার বাবার কাছে আখ্যা দিয়েছে। 


এবারে সোলেমান এবং এলাকার মাস্তান এর দল। সোলেমান কে অবশ্যই একজন সাইকো সিরিয়াল কিলার হিসাবে আখ্যা দেয়া যায় না। বরং তাকে দুষ্ট লোক বলা যায়। মানুষ কে বিব্রতকর পরিস্থিতি তে ফেলে সে আনন্দ পায় । তবে এই মানুষ দের মধ্যে কোনো বয়সের পরিসীমা নেই। ছোটবড় সকল বয়সের মানুষ কে শায়েস্তা করার একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা লক্ষনীয়। তবে এক দিক থেকে সমাজের বোধ হীন মানুষের জন্য একই রকম ফর্মুলা আপন করাটাও মাঝে মাঝে খারাপ না। যেমন রাস্তায় যেখানে সেখানে মূত্র বিসর্জনধারী দের হয়তো এই ভাবেই শিক্ষা দেয়া উচিত। আবার একই সাথে ছোটো বাচ্চাদের সাথে একই রকম আচরণ কিন্তু একটূ কঠিন হয়ে পরে। এটা সোলেমান এর বহু মানুষ কে শায়েস্তা না করতে পারার ও একটা সুপ্ত বাসনা থেকে করতে পারে। আর এলাকার মাস্তান দল সহজ ভাবে একটা আন্টি সমাজ কে রিপ্রেজেন্ট করে। নিজের কাজকর্ম বাদ দিয়ে কার বাড়িতে কি হচ্ছে সেটা নিয়ে পড়ে থাকা, এলাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সেইও বাড়ির লোকজন নিয়ে কথা বলা ইত্যাদি। 


এদিকে ডেভোলাপার রফিক কে আবার সরাসরি ই চিত্রায়ন করা হয়েছে। এই যে পুরনো বাড়ি গুলো মানুশ দিন দিন ধ্বংস করার মত সাহস করতে পারছে বা তাতের কে উষ্কে দেয়ার পেছনে মিডিয়া হিসাবে কারা কাজ করছে? মানুষ যে নিজেই নিজের বাড়ি ভাঙ্গার কথা চিন্তা করে বসে থাকে তা পুরো পুরী সঠিক ও হয়। রফিক এর মত মানুষেরা শুধু প্রফিট চিন্তা করবে। তাদের সাথে আর্টের একটা দা-কুমড়া সম্পর্ক। আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য সকল ডেভোলাপার কে রফিক বলা নয়। রফিক দের কে রফিক বলা আর কি। ডেভোলাপিং কম্পানি অবশ্যই অনেক সুন্দর কাজ ও করেছে হয়তো। আসলে দোষ টা তাদের ও যে তা বলা যায়না। সবাই স্বচ্ছল জীবন যাপন করতে চায়। সমাজের মধ্যে এই যে একটা ধনী হবার মজার খেলা চলছে সেটার জন্য অবশ্যই ব্যক্তি বিশেষ দায়ী নয়। আমার পাশের বাড়ীর একজন ই একই রকম বেতন পেয়ে যদি কৌশল করে আমার চাইতে অধিক টাকা পয়সা রোজগার করে এবং এর ফলে যদি তাঁর ব্যবহারে প্রভাব পড়ে তাহলে আমার মান সম্মানে কেন লাগবেনা? কেনো কারো ইচ্ছা হবেনা অমুকের সন্তান কে তিন বেলা দামী ব্র‍্যান্ডের দুধ,কাপড়চোপড় পরাতে দেখলে তার নিজের সন্তান কেউ পরানোর? তবে   মূলত রফিকের মত সুযোগ স্বন্ধানী দের অসহায় বলতে চাচ্ছি আর কি। 


কিসলু  হাসান বা হুমায়ুন ফরীদী এই সিনেমায় একজন ডেভোলাপার এর বিপরীত চরিত্রে অভিনয় করেছেন। শুধু ডেভোলাপার কেন এই যুগের অন্যান্য সব মানুষ থেকেই অনেক আলাদা। আমাদের মনে সাধারনত যে ধরনের কথা গুলো অবিরত চলতে থাকে রেডিওর মত। তিনি সেরকম কথা বলার একজন ধারক বলা যায়। তাঁর সমাজে তেমন বিশেষ ভূমিকা আছে বলে দেখা যায় না। তিনি সমাজের প্রভাবশালী কেউ নন, বিশেষ কোনো ব্যবসায়ি নন , বিশেষ কোনো মানব সেবায় নিয়োজিত নন, রাজনৈতিক কোনো বিষয়াদি আছে এরকম কিছুই নয় । তবুও তিনি সেই জন যে কোথাও না থেকে এইসকল কিছুই দেখেন। সকল কে ভালো কিংবা মন্দ বলে বিচার বিবেচনায় কোনো অস্থিরতা নেই, শাস্তি দেয়াতেও কোনো তাড়া নেই তবে তিনি তবুও সব কিছু দেখেন। এ দেশের মানুষের মন বোঝেন, গরীব দের প্রতি একটা সহানুভুতিশীল মনোভাব আছে। এবং সাধারণ একতা জীবন যাপন করতে ভালোবাসেন। তাঁর জীবনে কোনো পিছুটান নেই। সংসার এর কাছে সে কেনো পড়ে থাকবে তাঁর কোনো কারণ নেই। তিনি তাঁর মত। ভেতরে একটা রঙিন মন আছে। যা এখনো সরল আর শিশুসুলভ। যা এখনো ভালোবাসতে জানে। বয়স হলেই যে নিজেকে একটা সমাজের চিন্তায় ভাসিয়ে দেয়া লোক হয়ে যেতে হবে এমন কোনো চিন্তা তাঁর মধ্যে লক্ষ করা যায় নি। তবে তিনি মানুষ এর বিবেক কে প্রশ্ন করেন। ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। কোথায় আছেন কি করছেন সেটা সমাজের চোখে জায়গা না পেলেও নিজের কাছে নিজের অস্তিত্ব ঠিকই রয়েছে। বলতে গেলে খুবই স্বতঃস্ফূর্ত একজন চরিত্র এই সিনেমার।   



সিনেমার লাইট ক্যামেরার কিংবা ফ্রেমিং এর কথা যদি বলা হয়। ফ্রেমিং এ অনেক ক্ষেত্রের গ্রামার মেইনটেইন করা হয়েছে। মল্লিক সাহেব কে বহু বার ই লো এংগেল শটে দেখা যায়। ক্যামেরার বিষয় কে ক্ষমতাসম্পন্ন এবং শক্তিশালী বোঝানোর জন্য এটী ব্যবহার করা হয়। তবে লো এংগেল শটার কাজ টা হচ্ছে সাবজেক্ট এর অভিব্যক্তি টা স্পষ্ট করে বোঝানো। মল্লিক সাহেব তাতে সফল হয়েছেন। এবং এভাবে মল্লিক সাহেব কে একজন গুরুজন এবং সম্মানী লোক হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। 


 সোলেমান এর ক্ষেত্রে দেখা যায় হাই এংগেল থেকে ক্যামেরা ধরতে এটার দুইটা মিনিং থাকতে পারে একটা হচ্ছে সাবজেক্ট কে মল্লিক সাহেব এর অধিনস্ত দেখানর জন্য আরেকটা হচ্ছে মল্লিক সাহেব এর পয়েন্ট অফ ভিউ শট।হাই এংগেল শট এর ক্ষেত্রেও অভিব্যক্তি চরম ভাবে প্রকাশ পাবে। এবং এই এংগেল টা ব্যবহার করা হয় চরিত্রের অবদমন কিংবা ধ্বংস অবস্থা দেখানোর জন্য। নির্দিষ্ট জায়গা বা লোকেশন বড় করে দেখানোর জন্য ও এই শট ব্যবহার করা হয়। এই রকম হাই এংগেল শট আমরা এভেঞ্জার্স এ অনেক দেখেছি। যেমনঃ যখন ক্ষমতাসম্পন্ন হিরো দের কাছে বড় বড় শত্রু আসে এবং  তখন হিরোদের দেখা যায় হাই এংগেল শটে কারণ তাদের কাছে যে সকল প্রতিদ্বন্দি আসে তাদের কে আরো বেশী শক্তিশালী বোঝানোর উদ্দেশ্যে। 


ওভার হেড শট কোথাও দেখা যায় নি। এই শট কোনো জটিল বা কোনো একটা করুণ বা চিন্তাগ্রস্থ অভিব্যক্তি প্রকাশ করার জন্য ব্যবহার করা হয় ।তবে এই সিনেমায় খুব একটা এই শট ব্যবহার করা হয় নি। মল্লিক সাহেব এর আর্থিক অবস্থা দেখানোর জন্য কিছু কিছু সময় ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন কত পুরানো জিনিষ পত্র এই বাড়িত তে আছে সেটা দেখানোর জন্য ব্যবহার করার হয়েছে, রুবা যখন বাড়ি তে ঘুরতে ঘুরতে তাদের বসার ঘরে আসে তখন একটা ঝুলন্ত বাতি দেখা যায়। ততকালীন সময়ে এই বাতি থাকা মানে অভিজত্যের প্রতীক। বসার ঘরে এন্টিক বাতি,আরাম কেদারা। যদিও এই সমস্তই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। নতুন জিনিষে তেমন আভিজাত্যের ছাপ পাওয়া যায়না। বরং মল্লিক সাহেব কে দেখে মনেহয় তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।      


এরপর যদি শট বাই শট ধরা হয় প্রথম দিকে গ্রামার মেইনটেইন করে শট সাজানো বা স্টোরি বোর্ডিং করা হলেও পরের দিকে রুল এত টা মেইনটেইন করতে দেখা যায় নি। তবে যত বিশাল পরিমানে মেনে কাজ করা হয়েছে তাতে এই সব ছোটোখাটো ভুল ধরাটা অভদ্রতার চূড়ান্ত হয়ে যায়। 

ছবির  লাইটিং কতটুকু ভালোমানের হয়েছে সেটা অনলাইনের প্রিন্ট দেখে বলা অত সহজ নয়। তবে এখানে ছায়া কে খুব শার্প ভাবে ধরা হইছে। খুব অনন্য রকমের ফ্রেম যে ধরার প্রয়োজন ছিলো এই সিনেমায় তাও না। সাধারণ গল্প সধারণ দৃষ্টি দিয়ে দেখানো হয়েছে।এটাই হয়তো স্বাভাবিক ছিলো। লাইটিং এর ক্ষেত্রে  একটা বিষাদময় লাইটিং তৈরী করা হয়েছে। ছবির এফেক্ট ও  বিষাদমাখা। গল্প অন্তত তাই প্রত্যাশা করে। তবে ফ্রেম এর সাইজের চেয়ে ফ্রেম টা কোথা থেকে ধরা হয়েছে সেই বিষয় টা লক্ষনীয়। মলিক সাহেব এর এলাকার বাইরে রাস্তায় হাটার সময় গ্রিলের ভেতর থেকে শট নেয়া হয়েছ। তাঁর ভেতরকার দায়বদ্ধতা কিংবা সামাজিকতার হাতে তিনি যে নিতান্তই একজন নিয়মপালনকারী মানুষ সেটা হয়তো এই ফ্রেমের দ্বারা কিছুটা বোঝা যায়।অবশ্যই 'সিটিজেন কেইন'(১৯৪০)  এর মত বিস্তর আলোচনা করার মত এত জিওমেট্রিক শেপ ধরা হয়নি। বা স্পেস মেইনটেইন ও করা হয়নি। দর্শক হিসাবে আমার নিজের ও নজর বেশী ছিলো অভিনয় আর ফ্রেম এ। আর অবশ্যই সুরে।    


সিনেমার সংগীত নিয়ে ভুড়ি ভুড়ি প্রসংশা ছাড়া অন্য কিছু আসা আসা কষ্টক।  সিনেমার সংগীত পরিচালক  ছিলেন দেব্যজ্যোতি মিশ্র। তিনি অনেক সিনেমাতেউ সংগীত পরিচালক হিসাবে কাজ করেছেন। ঋতূপর্ণ ঘোষের পরিচালিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উল্লেখযোগ্য কাব্যনাট্য  চিত্রাঙ্গদা সিনেমায় কাজ করেছেন। রেইনকোট এ কাজ করেছেন।  তবে তিনি একজন সংগীত শিল্পী হিসাবেই দক্ষতা অর্জন করেছেন তা নয়। তিনি একজন চিত্রশিল্প, গীতিকা, সুরকার ও কবি।  তিনি কলকাতার এত সিনেমা তে কাজ করেছেন  যে বলে শেষ করা যাবেনা। অটোগ্রাফ সিনেমায় নতুন ধারা যোগ করেছেন বাংলা সিনেমার সংগীত এ। তিনি বাংলাদেশ এর অপেরা তে কাজ করছেন বর্তমানে। তও এই চলচ্চিত্রে তিনি যে  সংগীত পরিচালনা করেছেন।  সাউন্ডট্র‍্যাক এ তিনি পুরোনো বাড়ির সরলতার একটা প্রতিমা তুলে ধরেছেন। সেতার এবং তানপুরা দিয়ে চমৎকার একটা আবহ তৈরী করে ফেলেছেন। চোখের বালি,বাড়িওয়ালী, আরেকটি প্রেমের গল্পের যেই সুরের ভাষায় কথা বলেছিলেন।  রুবা কেউ সেরকম আলাদা একটা ভাষা দিয়েছেন তিনি। মল্লিক সাহেব এর চলাফেরার সময় খুব সচেতন ভাবে সুর পরিবর্তন করেছেন। মল্লিক সাহেব এর মানসিক টানপোড়ন সেটা সুর দিয়ে অনেক অংশেই বোঝাতে সফল হয়েছেন তিনি। তাছাড়া বিভিন্ন অস্থির বা একটু দ্রুত  কোনো দৃশ্যে পরিচালক এবং পরিচালক দুজনে মিলে মজার একটা টাইটেল ট্র‍্যাক তৈরী করেছেন। কিসলু ও রুবার প্রেমের সময় এর সংগীত এ আগে থেকেই একটা ট্র‍্যাজিক আর বাস্তব একই সাথে মিষ্টি অনুভুতি দেয়া হয়েছে। 


"কিনতে গিয়ে সোহাগ গয়না

সামনে দেখি খাচার ময়না" 


কি রূপক! কি না পাওয়ার বিষাদ!


"হাটি হাটি পা পা শুরু হয়

ভয় হয় শুধু ভয় ভয় হয়"-কিন্তু তবুও মন উড়তে চায়,অনেক কিছু বুঝতে চায় অনেক কিছু জানতে চায়-ইতি দুঃখমতী রুবা। 


যাই হোক,অনেক কথা বলা হলো,নটে গাছ টি মুড়োলো৷ শেষ করার আগে সিনেমা নিয়ে অল্প কিছু কথা বলে ইতি টানতে চাই। এই সিনেমা সেখা উচিত কেনো সে বিষয়ে গম্ভীর  কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়না। কারণ এ চলচ্চিত্র জাতি ও জেনারেশন কে এগিয়ে নিয়ে যাবে কিনা জানিনা।  শুধু একটা কঠিন সত্য উপলব্ধি করা আর কি। ঐতিহাসিক নিদর্শন, সুন্দর স্থাপত্য শিল্প ধ্বংসের পথে। জানি না এর কোনো আইনগত অবস্থা আছে কিনা। থাকলে নেয়া উচিত। আর যদি না থাকে তাহলে কি এই শিল্প বাঁচানো সম্ভব? বাংলাদেশে যেখানে মানুষ দৈনন্দিন এর খাওয়া পড়ার মত মৌলিক চাহিদা পূরনেই হিমশিম খায় সেখানে কি মানুষ আদৌ শিল্পের প্রসার এর জন্য বিল্পবী হয়ে উঠবে? কেউ কি কোনো পদক্ষেপ নিবে?  নাকি সকালে উঠে তাড়াহুড়া করে উঠে কোনো রকমে খেয়ে পড়ে অফিসে যেয়ে উর্ধতন কর্মকর্তার কটু কথা শুনে  আবার বাড়ি ফিরে আসতে আসতে সূর্য নিভে যাবে?         


References : 

  • Roberge,G.Fr.(2005) The Subject of Cinema. Sea Gull Publication 

  • Bengal Institute. 

https://bengal.institute/team/enamul-karim-nirjhar/?fbclid=IwAR34vX5Ov-ixmtSQ5FSetCJDOXqYuour-xVVq5pQjNHfDjJwvVvqmgkD270

Final Verdict

আবার বাড়ি ফিরে আসতে আসতে সূর্য নিভে যাবে?

46 views • 0 reviews
Mahzuba
Mahzuba Tazri
Film Critic
View all criticisms
Film Details
Film আহা
Director এনামুল করিম নির্ঝর
Year 2007
Genre ড্রামা
Language বাংলা
Country বাংলাদেশ
Runtime 120
Author Rating 9.4/10
Reader Rating 0/10 (0)

Reader Reviews

0 (0 reviews)

Rate & Review

5.0 /10

No reviews yet. Be the first to review!

Film Fiesta Newsletter

Stay in the Loop with Film Fiesta

Get the latest updates on screenings, festivals, critic reviews, and exclusive film events delivered straight to your inbox.

Join thousands of film lovers — no spam, unsubscribe anytime.